তারেক মাহমুদ, লক্ষ্মীপুর: লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার নয় জেলে প্রায় ছয় মাস ধরে মিয়ানমারে বন্দি রয়েছেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষগুলো দীর্ঘদিন ধরে কাছে না থাকায় চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটছে স্বজনদের। একই ঘটনায় আটক এক জেলে সম্প্রতি দেশে ফিরলেও বাকি ৯ জনের ফেরার অপেক্ষায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে তাদের পরিবারের।
রামগতির চরপোড়াগাছা এলাকার কোহিনূর বেগমের দুই ছেলে তামজিদ ও তাহমিদও ছিলেন আটক জেলেদের মধ্যে। সম্প্রতি ছোট ছেলে তাহমিদ দেশে ফিরলেও বড় ছেলে তামজিদ এখনো মিয়ানমারে বন্দি। ছেলের ছবি হাতে নিয়ে তার ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন কোহিনূর বেগম। তিনি বলেন, ‘ঈদের পরদিন তারা সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিল। সেখান থেকে মিয়ানমার আর্মি তাদের আটক করে। ছয় মাস ধরে ছেলের অপেক্ষায় আছি। ধারদেনা করে ছোট ছেলেকে এক মাধ্যমে ফিরিয়ে এনেছি। বড় ছেলে এখনো বন্দি।’
দীর্ঘ ছয় মাস বন্দি থাকার পর সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন তাহমিদ। তার ভাষ্য, সাগরে মাছ ধরার সময় ঝড়ের কবলে পড়ে তারা ভুল করে মিয়ানমারের সীমান্তে ঢুকে পড়েন। পরে মিয়ানমারের সেনারা গুলি চালিয়ে তাদের আটক করে। বয়স কম হওয়ায় তাহমিদকে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির জিম্মায় দেওয়া হয়। পরে দূতাবাসের মাধ্যমে তিনি দেশে ফেরেন।
তাহমিদ বলেন, ‘ঝড়ের কবলে পড়ে আমরা ভুল করে মিয়ানমার সীমান্তে ঢুকে পড়ি। পরে তারা গুলি চালিয়ে আমাদের আটক করে। আমার বয়স কম হওয়ায় আমাকে একজন মেম্বারের জিম্মায় দেওয়া হয়। বাকি নয়জনকে জেলে পাঠানো হয়। সেখানে তাদের অবস্থা খুবই খারাপ।’
তাহমিদ দেশে ফিরলেও পরিবারটির স্বস্তি পুরোপুরি ফেরেনি। কারণ তার বড় ভাই তামজিদসহ রামগতির আরো আট জেলে এখনো মিয়ানমারে বন্দি। তাহমিদের ভাষ্য, শেষবার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার সময় দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানিয়েছিলেন তামজিদ।
একই গ্রামের জেলে জাবের হোসেনের স্ত্রী রাশেদা বেগমের সংসারেও নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। স্বামী দীর্ঘদিন বন্দি থাকায় সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। সংসারের খরচ চালাতে তাকে রান্নার কাজও করতে হচ্ছে।
রাশেদা বেগম বলেন, ‘স্বামী না থাকায় অনেক কষ্টে আছি। ছেলে-মেয়েদের তিনবেলা খাবার দিতে পারি না। ওরা বাবার কথা জিজ্ঞেস করলে কী বলব, কিছুই বুঝি না।’
পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ মার্চ ‘মা-বাবার দোয়া’ নামের একটি ট্রলারে লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের ১৬ জন মাঝিমাল্লা ও জেলে মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়ন থেকে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যান। পরদিন থেকেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে ২৮ মার্চ মহেশখালী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন ট্রলারটির মালিক মিজানুর রহমান।
বন্দি লক্ষ্মীপুরের জেলেরা হলেন- আমজাদ হোসেনের ছেলে মো. জুয়েল, সোনালী গ্রাম এলাকার রুহুল আমিনের ছেলে ফরহাদ হোসেন, চরপোড়াগাছা এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে মো. নিরব, শাহাব উদ্দিনের ছেলে মো. রাকিব হোসেন, আবুল কালামের ছেলে মো. সাদ্দাম হোসেন, চরগজারিয়া এলাকার নুর ইসলামের ছেলে মো. মেজবাহ উদ্দিন, একই এলাকার আবু তাহেরের ছেলে মো. তামজিদ, চরগাজীর দক্ষিণ টুমচর গ্রামের নূর উদ্দিনের ছেলে মো. লিটন এবং কমলনগরের চর জগবন্ধু এলাকার মৃত আনিছুল হকের ছেলে মো. অজি উল্যাহ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একই এলাকার নয় জেলে দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারে বন্দি থাকায় তাদের পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগে পড়েছে। দ্রুত তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দীন বলেন, বন্দি জেলেদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাদের পরিবারের জন্য সহায়তার ব্যবস্থাও করা হবে।
দীর্ঘদিন ধরে স্বজনদের বন্দিত্বে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় থাকা পরিবারগুলোর দাবি, কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত তাদের স্বজনদের দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। পাশাপাশি উপার্জনক্ষম মানুষ হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়া পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হোক।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১৬/৯/২০২৬