সাইবার অপরাধ তদন্ত ও ডিজিটাল ফরেনসিক কার্যক্রমকে স্থায়ী ও সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোয় স্বতন্ত্র ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ গঠনের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। একজন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে প্রাথমিকভাবে পুলিশের বিদ্যমান জনবল ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে ইউনিটটির কার্যক্রম শুরু হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-৩ শাখা থেকে গত ২১ সেপ্টেম্বর পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তানভীর-আল-নাসীফ স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোয় বিশেষায়িত ও স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, পুলিশের বর্তমান জনবল ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে সাইবার পুলিশ ইউনিটের কার্যক্রম শুরুর নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তবে ইউনিটটির পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো, নতুন পদের সংখ্যা, যানবাহন ও অন্যান্য লজিস্টিকস এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি এবং যানবাহন টিওঅ্যান্ডইভুক্তকরণসহ পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব তিন কার্যদিবসের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের চিঠি অনুযায়ী, গত ১৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ অধিদফতর থেকে পাঠানো প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ জনবল কাঠামো অনুমোদনের আগেই পুলিশের বিদ্যমান সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ইউনিটটির কার্যক্রম শুরুর পথ তৈরি হয়েছে।
কেন আলাদা ইউনিট: এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে পুলিশ স্টাফ কলেজের পরিচালনা বোর্ডের সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, পুলিশের প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ে অভিজ্ঞ সদস্যদের কাজে লাগিয়ে একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ ও প্রাতিষ্ঠানিক সাইবার নিরাপত্তা ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা চলছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে পুলিশ সদর দফতর, ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার ইউনিট এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগ বিভিন্ন ডিজিটাল অপরাধের তদন্ত ও ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনেকটা বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালনা করছে। এসব কার্যক্রমের জন্য একটি স্থায়ী ও সমন্বিত কাঠামো প্রয়োজন।
নতুন ইউনিটের মাধ্যমে পুলিশের বিভিন্ন শাখায় ছড়িয়ে থাকা সাইবার অপরাধ তদন্ত, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে নতুন ইউনিট গঠনের পর অপরাধ তদন্ত বিভাগ, ঢাকা মহানগর পুলিশ বা পুলিশের বিদ্যমান সাইবার ইউনিটগুলোর দায়িত্ব ও এখতিয়ার কীভাবে পুনর্বিন্যাস হবে, সে বিষয়ে ২১ সেপ্টেম্বরের চিঠিতে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।
দেশজুড়ে সাইবার ও ফরেনসিক ল্যাব: নতুন ইউনিটের পাশাপাশি ডিজিটাল ফরেনসিক অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও করছে সরকার। সোমবার চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, থানা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় ইউনিট পর্যন্ত ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার ল্যাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে চীনের সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। সিআইডির নেতৃত্বে একজন অতিরিক্ত আইজিপি, একজন অতিরিক্ত ডিআইজি এবং সাইবার ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তাসহ পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল চীনে পাঠানোর কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
প্রতিনিধি দলটি চীনের সাইবার ল্যাব ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা পরিদর্শন করে দেশে প্রয়োজনীয় ফরেনসিক ল্যাব ও সরঞ্জাম স্থাপনের বিষয়ে প্রস্তাব দেবে বলে জানান তিনি।
এর আগে চলতি বছরের মে মাসে সাইবার অপরাধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও ভুয়া তথ্যসহ বিভিন্ন ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলায় পৃথক সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল সরকার।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ নীতিগত অনুমোদনের মধ্য দিয়ে সেই পরিকল্পনা এখন প্রশাসনিক বাস্তবায়নের পর্যায়ে গেল। তবে ইউনিটটির পূর্ণাঙ্গ জনবল, শাখা-উপশাখা, দেশব্যাপী বিস্তৃতি, বাজেট, দায়িত্ব ও এখতিয়ার চূড়ান্ত হবে পুলিশ সদর দফতরের প্রস্তাব এবং পরবর্তী সরকারি অনুমোদনের পর।
সানা/আপ্র/২৩/৯/২০২৬