বিশ্বজুড়ে অন্তত ৯ কোটি বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষ খরা, বন্যা ও প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহসহ নানা ধরনের জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন। এসব মানুষের বড় একটি অংশ বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে রয়েছেন। সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত অভিঘাতে তাদের জীবন আরো অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)।
আসন্ন জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১ সামনে রেখে শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের মোট বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এমন দেশগুলোতে বসবাস করছেন, যেগুলো তীব্র জলবায়ু ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের মতো দেশও রয়েছে।
ইউএনএইচসিআরের সহকারী হাইকমিশনার (অপারেশন্স) অ্যান্টন লেইস গার্সিয়া বলেন, সংঘাতকবলিত ও ভঙ্গুর এলাকাগুলোতে জলবায়ু অভিযোজন কেবল উন্নয়নমূলক উদ্যোগ নয়, বরং মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত। যেসব জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রয়োজন, তাদের কাছেই জলবায়ু অর্থায়ন পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিবেদনে বাস্তুচ্যুত মানুষের জলবায়ুজনিত দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে সুদানের এক নাগরিকের অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের জুনে সুদানের আল-ফাশিরে সংঘাত শুরু হলে প্রাণ বাঁচাতে তিনি পূর্ব চাদের ফারচানা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানে ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহে নদী ও জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। খাবার পানির সন্ধানে তাকে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। অনেক সময় পুরো এক সপ্তাহেও নিরাপদ পানি পান করা সম্ভব হয় না।
ইউএনএইচসিআর সতর্ক করেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের নিজ দেশে স্থায়ী ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন আরো কঠিন হয়ে উঠছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে নিজ দেশে ফিরে যাওয়া শরণার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এমন দেশে ফিরেছেন, যেগুলো তীব্র জলবায়ু ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে প্রত্যাবাসনের পরও তাদের নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
এর উদাহরণ হিসেবে সিরিয়ার পরিস্থিতি তুলে ধরেছে সংস্থাটি। সম্প্রতি দেশটিতে ফিরে যাওয়া প্রায় ৪০ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ তীব্র পানিসংকট ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মুখে পড়েছেন। এর মধ্যে গত মে মাসে ইউফ্রেটিস বা ফোরাত নদীর বন্যায় দেশটির হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকে আবারো বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে ভবিষ্যতের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে সাব-সাহারান আফ্রিকার প্রতি তিনটি শরণার্থী শিবিরের একটিতে বছরে অন্তত ১০০ দিন প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। ইথিওপিয়ার হেলাওয়েনের মতো কয়েকটি শরণার্থী শিবিরে বছরে ২০০ দিনেরও বেশি সময় তীব্র তাপপ্রবাহ স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে হিটস্ট্রোক ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়বে। অথচ এসব শিবিরে পর্যাপ্ত শীতলীকরণ ব্যবস্থা, পানি ও বিদ্যুতের অভাবে শরণার্থীদের প্রচণ্ড গরম থেকে সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।
এ ছাড়া পূর্বাভাসে উল্লেখ করা বড় ধরনের এল নিনো পরিস্থিতি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইউএনএইচসিআর। এর প্রভাবে পূর্ব আফ্রিকার সোমালিয়া, কেনিয়া, দক্ষিণ সুদান ও উগান্ডায় চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে খরা ও বন্যার কারণে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইভাবে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ বৃদ্ধির ঝুঁকিও রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠেয় কপ৩১ জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নিতে যাওয়া বিশ্বনেতা ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর প্রতি অভিযোজন খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের মাত্র ১০ শতাংশের মতো অর্থ ভঙ্গুর ও সংঘাতকবলিত দেশগুলোতে পৌঁছায়। অথচ এসব দেশের বাস্তুচ্যুত মানুষ ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের তুলনায় এই অর্থ অত্যন্ত অপ্রতুল। পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও কার্যকর অভিযোজন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়বে। সূত্র: রয়টার্স
সানা/আপ্র/৬/১১/২০২৬