বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সক্ষমতায় উচ্চগতির বুলেট ট্রেন তৈরির পথে এগোচ্ছে ভারত। দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩৫০ কিলোমিটার গতির ‘বি৩৫’ বুলেট ট্রেন তৈরি করতে চায়। এই ট্রেনের নকশাগত গতি জাপানের পরবর্তী প্রজন্মের ‘ই১০’ সিরিজের ট্রেনের সমপর্যায়ের হবে।
ভারতের রেল মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, মুম্বাই-আহমেদাবাদ উচ্চগতির রেল প্রকল্পের পাশাপাশি দেশীয় উচ্চগতির ট্রেন তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জাপান ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভারতকে জানিয়েছিল, তাদের বর্তমান ‘ই৫’ সিরিজের ট্রেনের উৎপাদন ধাপে ধাপে বন্ধ করা হবে। নতুন ‘ই১০’ সিরিজের উৎপাদন ২০৩০ সালে শুরু হওয়ার কথা এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে সেগুলো চলাচলে আসতে পারে।
ভারতের পরিকল্পনা হলো, জাপানের নতুন প্রজন্মের ট্রেনের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের প্রযুক্তিতে আরো দ্রুতগতির বি৩৫ তৈরি করা। একই সঙ্গে জাপানের ই১০ ট্রেন ভারতে ব্যবহারের সম্ভাবনাও ভবিষ্যতে বিবেচনা করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে ভারতীয় রেলওয়ে বি২৮ নামে নিজস্ব উচ্চগতির ট্রেন তৈরির কাজ শুরু করেছে। এসব ট্রেনের নকশাগত সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৮০ কিলোমিটার। তবে বাণিজ্যিকভাবে এগুলো ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৪৯ কিলোমিটার গতিতে চলবে। দুটি প্রাথমিক নমুনা ট্রেন ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে পরীক্ষামূলক চলাচলের জন্য প্রস্তুত হওয়ার কথা রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভারত আর্থ মুভার্স লিমিটেড বি২৮ ট্রেন তৈরির দায়িত্ব পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ৩২টি ট্রেন তৈরির চুক্তি পেয়েছে। এর পাশাপাশি আরো ১৫টি ট্রেন তৈরির জন্য প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি রুপির একটি পৃথক চুক্তিও হয়েছে।
দেশীয় উচ্চগতির ট্রেন তৈরির পাশাপাশি ট্রেন পরিচালনার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও নিজেদের প্রযুক্তিতে গড়ে তুলতে চাইছে ভারত। এ জন্য ‘ভারত ট্রেন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা’ তৈরির কাজ চলছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ট্রেনের গতি, পরস্পরের মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব এবং চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন প্রকল্প হচ্ছে ৫০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ মুম্বাই-আহমেদাবাদ উচ্চগতির রেল করিডর। পুরো প্রকল্পটি ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এর একটি অংশ ২০২৭ সালে চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
মহারাষ্ট্র, গুজরাট এবং দাদরা ও নগর হাভেলির মধ্য দিয়ে নির্মিতব্য এই করিডরে থাকবে ১২টি স্টেশন। এগুলো হলো মুম্বাই, থানে, ভিরার, বোইসার, ভাপি, বিলিমোরা, সুরাট, ভারুচ, ভাদোদরা, আনন্দ, আহমেদাবাদ ও সাবরমতী।
এদিকে প্রকল্পটির ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংশোধিত হিসাবে মুম্বাই-আহমেদাবাদ উচ্চগতির রেল প্রকল্পের ব্যয় ২ লাখ কোটি রুপির বেশি হয়েছে, যা ২০১৫ সালের প্রাথমিক হিসাবের প্রায় দ্বিগুণ। ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে ভূমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ, ট্রেন ও সংকেতব্যবস্থাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির কথা উঠে এসেছে।
বি২৮ ট্রেনের পর বি৩৫ তৈরির পরিকল্পনাকে ভারতের উচ্চগতির রেল প্রযুক্তিতে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরির বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মুম্বাই-আহমেদাবাদ করিডরকে কেন্দ্র করে এই সক্ষমতা গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে দেশটির অন্যান্য উচ্চগতির রেলপথেও দেশীয় ট্রেন ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ভারত ইতোমধ্যে আরো সাতটি উচ্চগতির রেল করিডর নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মুম্বাই-পুনে, পুনে-হায়দরাবাদ, হায়দরাবাদ-বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ-চেন্নাই, চেন্নাই-বেঙ্গালুরু, দিল্লি-বারাণসী এবং পাটনা হয়ে বারাণসী-শিলিগুড়ি রুট। ফলে বি২৮ থেকে বি৩৫ পর্যন্ত দেশীয় ট্রেন তৈরির সক্ষমতা ভবিষ্যৎ উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারতের লক্ষ্য এখন শুধু বুলেট ট্রেন আমদানি নয়; ট্রেন, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির বড় অংশ নিজেদের সক্ষমতায় তৈরি করে উচ্চগতির রেল খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলা।
সানা/আপ্র/২৩/৯/২০২৬