উত্তর আফ্রিকার মরক্কো সীমান্তসংলগ্ন স্প্যানিশ ছিটমহল সেউতায় অভিবাসীদের ব্যাপক প্রবেশকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুই সদস্য স্পেন ও ইতালির মধ্যে বিরোধ আরো তীব্র হয়েছে। ইতালির একতরফা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এবার ইতালি থেকে স্পেনে আকাশ ও নৌপথে আসা যাত্রীদের ওপরও অতিরিক্ত পরীক্ষা শুরু করেছে মাদ্রিদ।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) মধ্যরাত থেকে স্পেনের এ ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এটি বহাল রাখার কথা জানিয়েছে স্পেন সরকার।
এর আগে সেউতায় মরক্কো থেকে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী প্রবেশের পর ইতালি স্পেন থেকে আসা যাত্রীদের ওপর একই ধরনের অতিরিক্ত সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। রোমের দাবি, সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীরা পরে শেনজেন এলাকার অন্য দেশে পৌঁছাতে পারে-এ আশঙ্কা থেকেই তারা এ ব্যবস্থা নিয়েছে।
স্পেন অবশ্য ইতালির এ যুক্তিকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। মাদ্রিদের বক্তব্য, সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের মূল শেনজেন এলাকায় প্রবেশের সুযোগ নেই। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের দপ্তরও জানিয়েছে, সেউতায় নতুন করে বড় ধরনের অভিবাসী ঢলের আশঙ্কা নেই; বরং মরক্কোর কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অপতথ্য থেকেই এ ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার অবশ্য স্পেনের এ বক্তব্য মেনে নেয়নি। রোম জানিয়েছে, অন্তত ১৫ আগস্ট পর্যন্ত স্পেনের যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকবে। ইতালির আশঙ্কা, আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে সেউতায় অভিবাসীদের নতুন ঢল নামতে পারে।
স্পেনের পাল্টা সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইতালি থেকে আসা যাত্রীদের পরিচয়, জাতীয়তা ও ভিসাসহ প্রয়োজনীয় নথি পরীক্ষা করা হবে। ইতালি জানিয়েছে, তাদের আরোপ করা অতিরিক্ত পরীক্ষা মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; ইতালীয় নাগরিকেরা এর আওতামুক্ত। তবে স্পেনের পাল্টা ব্যবস্থায় যাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত সীমান্ত পরীক্ষা ও নথি যাচাইয়ের কারণে যাতায়াতে বিলম্বের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দুই দেশের এ বিরোধের পেছনে স্পেন ও ইতালির অভিবাসননীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্যও ভূমিকা রাখছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ তুলনামূলকভাবে উদার অভিবাসননীতির পক্ষে অবস্থান নিলেও ইতালির রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন ব্যবস্থায় আরো কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি করে আসছেন।
সেউতা সংকটকে কেন্দ্র করে ইতালির শেনজেন-সংক্রান্ত পদক্ষেপে ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক সমর্থন জানিয়েছে। অন্যদিকে চেক প্রজাতন্ত্র থেকে স্পেনের শেনজেন-সদস্যপদ সাময়িকভাবে স্থগিতের দাবিও উঠেছে। এতে অভিবাসন ইস্যুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরের মতপার্থক্য আরো প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে।
মরক্কো থেকে সমুদ্রপথে ও অন্যান্য উপায়ে সেউতায় প্রবেশ করা বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর বেশির ভাগকে কয়েক দিনের মধ্যে ফেরত পাঠানো হলেও সেখানে এখনো প্রায় ১ হাজার ৪০০ শিশু অবস্থান করছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সেউতা সংকটের নেপথ্যে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায়ের কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে। ওই রায়ে সমুদ্রে আটক অভিবাসীদের সরাসরি গণহারে মরক্কোয় ফেরত পাঠানোর বিষয়ে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসনবিষয়ক কমিশনার ম্যাগনুস ব্রুনার বলেছেন, মানবপাচারকারী চক্রগুলো আদালতের রায়ের সুযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ছড়িয়ে অভিবাসীদের সেউতার দিকে আসতে উৎসাহিত করছে।
সেউতা ও মেলিলা-উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত স্পেনের দুটি ছিটমহল। দীর্ঘদিন ধরেই এ দুটি ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব নিয়ে মরক্কোর সঙ্গে স্পেনের বিরোধ রয়েছে। মরক্কো এ দুটি অঞ্চলের ওপর স্পেনের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে না।
সেউতার সাম্প্রতিক অভিবাসন সংকট তাই শুধু সীমান্ত ও মানবিক সমস্যায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক ও শেনজেন ব্যবস্থার ওপরও পড়তে শুরু করেছে। স্পেন ও ইতালির পাল্টাপাল্টি সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ সেই বিরোধকে আরো দৃশ্যমান করে তুলেছে। সূত্র: বিবিসি
সানা/ডিসি/আপ্র/৮/৮/২০২৬