যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চাওয়া কিংবা নিজ দেশে ফেরত না পাঠানোর আইনি সুরক্ষা পাওয়া কিছু সমকামী, উভকামী ও রূপান্তরকামীসহ বিভিন্ন যৌন পরিচয়ের মানুষকে তৃতীয় দেশে পাঠাচ্ছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। এসব আশ্রয়প্রার্থীর অনেকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কোনো পূর্বপরিচয় বা সম্পর্ক নেই। এমনকি তাদের কাউকে কাউকে এমন দেশে পাঠানো হচ্ছে, যেখানে সমলিঙ্গের সম্পর্ক আইনত নিষিদ্ধ।
অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতির ফলে যৌন পরিচয়ের কারণে নিজ দেশে নিপীড়নের আশঙ্কায় আশ্রয় চাওয়া ব্যক্তিরা নতুন করে নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়ছেন।
চলতি বছরের জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অভিবাসী অধিকার সংগঠন ইমিগ্রেশন ইকুয়ালিটি সতর্ক করে জানায়, তৃতীয় দেশে পাঠানো কিছু আশ্রয়প্রার্থী নিপীড়ন, আটক, নির্যাতন এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারেন।
তুরস্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্র, এরপর মধ্য আফ্রিকায়
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে ‘আয়লিন’ নামে পরিচয় দেওয়া এক তুর্কি নারীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে তাঁর প্রকৃত নাম প্রকাশ করা হয়নি।
আয়লিনের ভাষ্য অনুযায়ী, যৌন পরিচয়ের কারণে তুরস্কে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং পরিবারের এক সদস্য তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। নিরাপত্তার আশায় তিনি দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান।
সেখানে ১৮ মাস আটক থাকার পর গত জুলাইয়ে তাকে হাতকড়া ও শিকল পরিয়ে একটি উড়োজাহাজে তোলা হয়। উড়োজাহাজে ওঠার পর তিনি জানতে পারেন, তাকে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠানো হচ্ছে। অথচ এর আগে দেশটি সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিচারক আয়লিনকে নিজ দেশে ফেরত না পাঠানোর আইনি সুরক্ষা দিয়েছিলেন। এর অর্থ, তুরস্কে ফেরত পাঠানো হলে তিনি নির্যাতনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে আদালত স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তবে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় দেওয়া হয়নি।
এরপর তৃতীয় দেশে বহিষ্কারের নীতির আওতায় আয়লিনকে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠানো হয়। সেখানে কয়েক সপ্তাহ অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটানোর পর শেষ পর্যন্ত তুরস্কে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
দেশে ফেরার আগে আয়লিন জানান, তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত। তুরস্কে ফিরে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন কি না, তা নিয়েও তাঁর উদ্বেগ রয়েছে।
তৃতীয় দেশে বহিষ্কারের নীতি নিয়ে উদ্বেগ
তৃতীয় দেশে বহিষ্কারের অর্থ হলো, কোনো অভিবাসীকে তার নিজ দেশে ফেরত না পাঠিয়ে অন্য একটি দেশে পাঠানো। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের চুক্তি ও ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করেছে।
সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ৩০টির বেশি দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করেছে।
ইমিগ্রেশন ইকুয়ালিটির জুনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নীতির কারণে যৌন পরিচয়ের জন্য নিপীড়নের আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চাওয়া ব্যক্তিদের একটি অংশ নতুন করে ঝুঁকিতে পড়ছেন। বিশেষ করে যেসব দেশে সমলিঙ্গের সম্পর্ক নিষিদ্ধ কিংবা যৌন সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সামাজিক বৈষম্য রয়েছে, সেখানে পাঠানো হলে তাদের নিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
ঘানার তরুণীকে পাঠানো হয়েছে ক্যামেরুনে
সিএনএনের প্রতিবেদনে ঘানার ২১ বছর বয়সী এক উভকামী নারীর অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে তার পরিচয় গোপন রেখে ‘আদওয়া’ নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
আদওয়া জানান, যৌন পরিচয়ের কারণে নিজ দেশে দীর্ঘদিন বৈষম্য ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত তাকে ঘানায় ফেরত না পাঠানোর আইনি সুরক্ষা দেওয়ার পরও ক্যামেরুনে পাঠানো হয়।
ক্যামেরুনে সমলিঙ্গের যৌন সম্পর্ক আইনত নিষিদ্ধ। আদওয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে তাকে একটি সরকারি আটককেন্দ্রে রাখা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি নিজেকে নিরাপদ মনে করছেন না।
মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিবাসী অধিকারকর্মীরা। যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৩ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে দেশটিতে সমলিঙ্গের যৌন আচরণ-সংক্রান্ত কিছু কর্মকাণ্ডকে আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে যৌন সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও আইনি বৈষম্যের কথাও উঠে আসে।
অধিকার সংগঠনের আপত্তি
যৌন সংখ্যালঘু অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ইমিগ্রেশন ইকুয়ালিটির ব্রিজেট ক্রফোর্ড বলেছেন, কোনো আশ্রয়প্রার্থীকে এমন দেশে পাঠানো হলে, যেখানে তার কোনো পরিচিত মানুষ কিংবা সহায়তার ব্যবস্থা নেই, তা গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
তার মতে, যৌন পরিচয়ের কারণে আগে থেকেই নিপীড়নের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের এমন দেশে পাঠানো হলে তাঁদের নিরাপত্তাঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।
সরকারের বক্তব্য ও আদালতের নির্দেশনা
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ তৃতীয় দেশে অভিবাসীদের বহিষ্কারের নীতিকে বৈধ বলে দাবি করেছে। বিভাগের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তির আওতায় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই অভিবাসীদের পাঠানো হচ্ছে।
মার্কিন অভিবাসন কর্মকর্তাদের মতে, যেসব ব্যক্তির যুক্তরাষ্ট্রে থাকার আইনি অধিকার নেই, তাদের বহিষ্কার করা সরকারের দায়িত্ব।
তবে তৃতীয় দেশে দ্রুত বহিষ্কারের এই নীতি নিয়ে আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জও হয়েছে। চলতি সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সার্কিট আপিল আদালত এ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন।
আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো আশ্রয়প্রার্থীকে তৃতীয় দেশে পাঠানোর আগে সেখানে তার নিরাপত্তা নিয়ে আপত্তি জানানোর কার্যকর সুযোগ দিতে হবে।
অভিবাসী অধিকারকর্মীদের উদ্বেগ, আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে কার্যকর না হলে নিজ দেশে নিপীড়ন থেকে বাঁচতে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চাওয়া ব্যক্তিরা তৃতীয় দেশে গিয়ে আবারো একই ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
সূত্র: সিএনএন।
এসি/আপ্র/২৬/৯/২০২৬