জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ দলটির অর্ধশতাধিক নেতা রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে দেখেছেন। শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে তাঁরা জাদুঘরের বিভিন্ন কক্ষ পরিদর্শন করেন। এ সময় নাহিদ ইসলাম জাদুঘরের ‘লাল টেলিফোন কক্ষে’ গিয়ে নির্দিষ্ট নম্বর ডায়াল করে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিভিন্ন কথোপকথনের অডিও শোনেন।
নাহিদ ইসলামের সঙ্গে জাদুঘর পরিদর্শনে ছিলেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, কেন্দ্রীয় নেতা সারজিস আলম, মাহিন সরকার, সারোয়ার তুষার, এস এম সাইফ মোস্তাফিজ, জাতীয় ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদারসহ দলটির অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী। পরে সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিনসহ আরো কয়েকজন তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন করেন। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, শনিবার সকাল নয়টার দিকে নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে এনসিপির প্রতিনিধিদল জাদুঘরে যায়। তখনো জাদুঘরটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি।
জাদুঘর চত্বরে প্রথমে তাঁরা বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ের বর্ণনাসংবলিত গ্রাফিতি, আলোকচিত্র, প্রতীকী কবর এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনার আদলে নির্মিত ভাস্কর্য ঘুরে দেখেন। সকাল সোয়া নয়টার দিকে তাঁরা মূল জাদুঘরে প্রবেশ করেন।
প্রবেশপথে ত্রিমাত্রিক আলোকচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে ৫ আগস্টের পর গণভবনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এরপরের একটি কক্ষে শেখ হাসিনার শাসনামলে ফ্যাসিবাদী শাসনকে টিকিয়ে রাখতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের অ্যানিমেশনচিত্র প্রদর্শন করা হয়। সেখানে প্রতীকী খুলিও রাখা হয়েছে।
এরপর এনসিপির নেতারা একটি কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে শক্ত কাচের নিচে ৫ আগস্ট বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার হাতে ক্ষতিগ্রস্ত তৎকালীন গণভবনের ইট, পাথর ও কাচের অংশ সংরক্ষণ করা হয়েছে। কক্ষটিতে আওয়ামী লীগ শাসনামলের বিভিন্ন আলোকচিত্র, গণভবন থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন নথির অনুলিপি এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে।
পরের অংশে ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ড, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক দলের ওপর দমন-পীড়নের বিভিন্ন আলোকচিত্র ও প্রতীকী উপস্থাপন রাখা হয়েছে। সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার বক্তব্যের বিভিন্ন ভিডিওচিত্রও প্রদর্শিত হচ্ছে।
এরপর এনসিপির নেতারা জাদুঘরের দক্ষিণ অংশে যান। সেখানে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম, নির্যাতন ও পঙ্গু করে দেওয়ার মতো বিভিন্ন ঘটনার আলোকচিত্র ও উপস্থাপন রয়েছে।
লাল টেলিফোনে কথোপকথন: পরে তাঁরা প্রবেশ করেন ‘লাল টেলিফোন কক্ষে’। এটি ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অফিসকক্ষ। সেখানে তিনটি আলাদা টেবিলে ছয়টি লাল টেলিফোন রাখা হয়েছে। টেলিফোনগুলোর পাশে তৎকালীন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তির নাম ও ফোন নম্বরের তালিকা রয়েছে।
নির্দিষ্ট নম্বরে টেলিফোনের বোতাম চাপলে শেখ হাসিনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কথোপকথনের অডিও শোনা যায়। নাহিদ ইসলাম ওই কক্ষে গিয়ে একটি নম্বর ডায়াল করে শেখ হাসিনার কথোপকথন শোনেন। এনসিপির নেতা সাইফুল্লাহ হায়দারও একটি লাল টেলিফোন কানে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার আহ্বান জানান।
দ্বিতীয় তলায় জুলাইয়ের স্মারক: জাদুঘরের নিচতলা ঘুরে দেখার পর সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে এনসিপির নেতারা দ্বিতীয় তলায় ওঠেন। সেখানে বিভিন্ন কক্ষে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে। তাঁরা কিছুক্ষণ এসব ভিডিও দেখেন।
পাশের অংশে রয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পোস্টারের সংগ্রহ। সেখানে অভ্যুত্থানের শহীদদের পরিচয়পত্র, হাতঘড়ি, মুঠোফোন, টুপি, জার্সি, গামছা, মানিব্যাগ, জ্যাকেট, প্যান্ট, কোট, টাই ও শার্টসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত সামগ্রী সংরক্ষণ করা হয়েছে। রয়েছে শহীদ শ্রমজীবী মানুষের ছবি এবং জুলাইয়ের সাংস্কৃতিক কর্মীদের আলোকচিত্রও। পাশাপাশি রয়েছে জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহের সময়রেখা।
আরেকটি কক্ষে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকার বিভিন্ন আলোকচিত্র প্রদর্শন করা হয়েছে। সকাল ১০টার দিকে সেখানে এনসিপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন।
জুলাই জাদুঘরের আরেক অংশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন স্মারক রাখা হয়েছে। সেখানে শহীদকে বহনকারী রিকশা, শহীদদের জুতা, বই, সুরমা, রুবিকস কিউব, ভলিবল, গ্লাভস, কাপ, মগ, কাপ-পিরিচ, প্লেট ও চশমাসহ বিভিন্ন সামগ্রী প্রদর্শন করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় তলার শেষ প্রান্তে নাহিদসহ এনসিপির নেতারা শেখ হাসিনার পাঠকক্ষও ঘুরে দেখেন। সেখানে শহীদ আবু সাঈদের পড়ার টেবিল রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিক্ষুব্ধ জনতার লেখা বিভিন্ন দেয়াললিখনও জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
সকাল ১০টা ১০ মিনিটে নাহিদ ইসলামসহ এনসিপির নেতারা মূল জাদুঘর থেকে বের হন। পরে তাঁরা জাদুঘর চত্বরে থাকা প্রতীকী আয়নাঘর, টিএফআই সেল ও নিষ্কাশন পাখার প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন। সবশেষে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক দফা দাবি ঘোষণার স্মৃতি তুলে ধরা গ্রাফিতি দেখেন। এরপর এনসিপির নেতারা জাদুঘর কার্যালয়ে গিয়ে প্রায় আধ ঘণ্টা আলোচনা করেন। বেলা ১১টার দিকে জাদুঘরের মূল ফটকে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলামসহ দলটির নেতারা।
সানা/আপ্র/৮/৮/২০২৬