রাজধানীতে ভবন নির্মাণ ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে রিহ্যাব, রাজউকের পরিদর্শক ও ভবন মালিক-এই তিন পক্ষের যৌথ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম।
শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডুরা) আয়োজিত ‘ভূমিকম্প ঝুঁকিতে দেশ, আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।
রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে শুধু রাজউককে দায়ী করলে হবে না। ভবন মালিক, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং নকশা ও নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত প্রকৌশলী-স্থপতিদেরও দায়িত্ব রয়েছে। বাস্তবে বিভিন্ন পক্ষের যৌথ প্রক্রিয়ার মধ্যেই অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘রিহ্যাব, ভবন মালিক ও রাজউকের ইন্সপেক্টর-এই তিন পক্ষের যৌথ প্রযোজনায় অনিয়মগুলো হয়। সত্যি কথা বলছি, এই পরিস্থিতি রয়েছে।’ তবে কাউকে দোষারোপ করার উদ্দেশ্যে নয়, সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
রিয়াজুল ইসলাম বলেন, রাজউকের কোনো পরিদর্শক অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মিত ভবনকে নিয়ম না মেনেও ছাড়পত্র দিলে তাঁকেও জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং কারও কারও বিরুদ্ধে চাকরিসংক্রান্ত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে রাজউকে যে সংখ্যক পরিদর্শক থাকার কথা, বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে সেই সংখ্যা কমে এসেছে। তবে অনিয়ম বন্ধে কর্মকর্তাদের শাস্তির পাশাপাশি তাঁদের দায়িত্বশীল ও সচেতন করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশা পরিবর্তনের বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, কোনো ভবনের অনুমোদন ছয় তলার জন্য হলে সেটিকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ১০ তলা করে পরে শুধু জরিমানা নিয়ে বৈধ করার সুযোগ থাকা উচিত নয়। প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন ও কারিগরি যাচাই ছাড়া এ ধরনের ভবন অনুমোদন করা হলে ভবিষ্যতে তা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে ভবনের নকশা, মাটির গুণগত মান, নির্মাণকাজের তদারকি ও ভবন ব্যবহারের অনুমোদন-সব ক্ষেত্রেই নিয়ম মানার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। নকশা প্রণয়নকারী প্রকৌশলী ও স্থপতিদেরও নির্মাণকাজের বাস্তবায়ন ও তদারকিতে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান।
রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘এই কাজ একদিনে শেষ হবে না। যখন থেকে ভবন নির্মাণ শুরু হয়েছে, তখন থেকেই বিভিন্ন অনিয়ম চলে আসছে। আমরা এখন ধাপে ধাপে সেগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি।’
ভবন মালিক ও সংশ্লিষ্টদের অনুমোদিত নকশা মেনে নির্মাণকাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণকেও সচেতন হতে হবে। অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি অনিয়মের তথ্য গণমাধ্যমে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনা সভায় রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ভবন নির্মাণের ঝুঁকি সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে নিয়মিত ভূমিকা রাখতে হবে। প্রকৌশলী ও তদারকি সংস্থাগুলোকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিলো মোহাম্মদ খান বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি শুধু ভবনের নকশা বা নির্মাণমানের ওপর নির্ভর করে না; ভবনটি কোথায় এবং কী ধরনের মাটির ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্বল ও জলাভূমি এলাকায় অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দেয়।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, ঢাকায় অনুমোদিত ভবনের অতিরিক্ত তলা নির্মাণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রাজউকের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কোথাও কোথাও ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে ১০ তলা ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এসব ভবন চিহ্নিত করে দ্রুত পরিদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, ঢাকার প্রায় ছয় লাখ ভবনের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। আগাম প্রস্তুতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করা গেলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক সালেহ উদ্দিন বলেন, ভূমিকম্প মোকাবিলায় কোনো একক সংস্থার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। সমন্বিতভাবে সব পক্ষকে প্রস্তুতি নিতে হবে। ঢাকার আশপাশের ৪১টি ফায়ার স্টেশনকে এয়ারমার্ক করা হয়েছে এবং বিশেষ উদ্ধারকারী দলও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, ভূমিকম্পে মানুষ সরাসরি মারা যায় না; বরং ভবন ও স্থাপনা ধসে পড়েই প্রাণহানি ঘটে। তাই ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও সংশ্লিষ্ট আইন মেনে চলার পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
ডুরার সভাপতি শাহজাহান মোল্লা বলেন, ঢাকাসহ সারাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সঠিক তথ্য তুলে ধরে সরকার ও রাজউকের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমেও সহযোগিতা করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী হাসান আনসারী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ডুরার সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম। এ সময় ডুরার প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মিরাজ মাহবুব ইফতিসহ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
সানা/আপ্র/৮/৮/২০২৬