ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটিতে দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সিএনজি স্টেশনে গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। রান্নার চুলা জ্বলছে না, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না সিএনজিচালকরা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও দুই থেকে তিন দিন লাগতে পারে বলে জানিয়েছে সরকার।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর ফলে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহক—সব ক্ষেত্রেই গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা সার্বক্ষণিক মেরামতকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি সচল হলে গ্যাস সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে। সীমিত সরবরাহের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য জরুরি খাতে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস বণ্টনের চেষ্টা চলছে।
জ্বালানি উপদেষ্টা (বা দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী) ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি সমস্যার কারণে সরবরাহ কমেছে। তবে এলএনজিবাহী জাহাজ নিরাপদ দূরত্বে থাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে।
রাজধানীতে চরম দুর্ভোগ
ঢাকার বহু এলাকায় এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে নিম্নচাপের গ্যাস সরবরাহ চলছিল। নতুন এই সংকটে অনেক এলাকায় দিনের পুরো সময় চুলায় গ্যাস মিলছে না। কোথাও কোথাও গভীর রাতে অল্প সময়ের জন্য সামান্য গ্যাস এলেও তা রান্নার জন্য যথেষ্ট নয়।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা রাকিব হোসেন বলেন, প্রতিদিনই রান্না করতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। কয়েকদিন ধরে দিনের বেলায় একেবারেই গ্যাস নেই, ফলে বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন
রাজধানীর মেরুল বাড্ডা, মালিবাগ, মোহাম্মদপুর, মিরপুরসহ বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে দেখা গেছে শত শত গাড়ির দীর্ঘ সারি। অনেক চালক ৬ থেকে ১২ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও গ্যাস পাচ্ছেন না।
মেরুল বাড্ডার একটি সিএনজি স্টেশনে অপেক্ষমাণ চালক কাওছার মিয়া জানান, বুধবার সন্ধ্যা থেকে লাইনে আছেন, কিন্তু এখনো গ্যাস পাননি। আরেক চালক আনসার আলী বলেন, প্রায় সব পাম্পেই একই অবস্থা। গাড়ি চালাতে না পারায় মালিকের দৈনিক জমা দেওয়া তো দূরের কথা, পরিবারের খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্টেশনের এক বিক্রয়কর্মী জানান, গ্যাস সরবরাহ না থাকায় অনেক পাম্প পুরোপুরি বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। সরবরাহ এলেই আবার বিক্রি শুরু করা হবে।
দীর্ঘদিনের ঘাটতির ওপর নতুন চাপ
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের গ্যাস খাতে আগে থেকেই বড় ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার কোটি ঘনফুট, বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৬৫০ কোটি ঘনফুট। ফলে প্রতিদিনই এক হাজার কোটির বেশি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে। এই অবস্থায় এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের গ্যাস ব্যবস্থায় আমদানিনির্ভরতা এবং সীমিত উৎপাদন সক্ষমতার কারণে একটি টার্মিনালেও সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব সারা দেশে পড়ে।
এদিকে সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল দ্রুত চালুর জন্য দেশি-বিদেশি কারিগরি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন।
সানা/আপ্র/২৪/৭/২০২৬