পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরুর পথ তৈরি হলো।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ৩টার পর আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু হয় বলে প্রকল্পের ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস জানান। এর আগে দুপুরেই সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল হেলিকপ্টারে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় পৌঁছান। তাদের উপস্থিতিতেই পারমাণবিক চুল্লিতে ফুয়েল স্থাপনের কাজ শুরু হয়।
ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস বলেন, ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের সময় নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ঐতিহাসিক কার্যক্রমের সূচনার মাহেন্দ্রক্ষণে বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনীতে সংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, ইউরেনিয়াম লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে বেশ কিছু জটিল কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হবে। উৎপাদনের প্রাথমিক এ প্রক্রিয়াকে প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলছেন পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান শৌকত আকবর।
তার ভাষ্য, ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের মাধ্যমে দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল পর্যায়ে প্রবেশ করছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভৌত যাত্রা; যেখানে চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তি উৎপাদন শুরু হয়।
ফুয়েল লোডিং এবং আনুষঙ্গিক পরীক্ষা শেষে সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষ বা আগস্ট মাসের দিকে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে উৎপাদন বৃদ্ধি করে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে এ কেন্দ্র থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।
ঈশ্বরদী উপজেলার পদ্মা তীরে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এ প্রকল্পে দুটি ইউনিট থেকে মোট দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থা রসাটমের প্রকৌশল বিভাগ জেনারেল কন্ট্রাকটর হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ সঞ্চালনে প্রয়োজনীয় গ্রিড লাইনও প্রস্তুত হয়েছে বলে গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ-পিজিসিবি জানিয়েছে পাওয়ার।
ফুয়েল লোডিং প্রক্রিয়া: ইউরেনিয়াম ফুয়েল লোডিং হল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি বা রিঅ্যাক্টর কোরে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও চূড়ান্ত কারিগরি প্রক্রিয়া। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা, গ্যাস বা তেলের বদলে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়ামের ছোট ছোট পেলেট ব্যবহার করা হয়, যার প্রতিটি সাড়ে চার থেকে পাঁচ গ্রাম ওজনের হয়ে থাকে। এই পেলেটগুলোকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে জিরকোনিয়াম অ্যালয় দিয়ে তৈরি টিউবের ভেতর সাজিয়ে ‘ফুয়েল অ্যাসেম্বলি’ তৈরি করা হয়।
এই অ্যাসেম্বলিগুলোকে রিঅ্যাক্টরের ভেতর স্থাপন করার প্রক্রিয়াই হল ফুয়েল লোডিং। এটি সম্পন্ন হওয়ার পরই বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে ফিশন বা চেইন রিঅ্যাকশন (চুল্লিতে তাপ উৎপাদন) শুরু করা সম্ভব হয়।
ফুয়েল লোডিং একটি অত্যাধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া। একটি বিশেষ ‘ফুয়েল লোডিং মেশিন’ বা রিফুয়েলিং মেশিনের সাহায্যে এই কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে এ প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন হবে।
অনুমোদিত নিরাপত্তা কার্যপ্রণালী মেনে, রাশিয়ান ফেডারেশনের (রোসাটম) বিশেষজ্ঞদের সরাসরি সহায়তায় রূপপুর প্রকল্পের জন্য প্রশিক্ষিত ও যোগ্য বাংলাদেশি অপারেটর এবং ফুয়েল হ্যান্ডলাররা এই লোডিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছেন। আসল ইউরেনিয়াম জ্বালানি ভরার আগে রিঅ্যাক্টরের সব সিস্টেম, পরিবহন সরঞ্জাম এবং লোডিং যন্ত্রপাতি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা যাচাই করতে ‘ডামি ফুয়েল’ (আসল জ্বালানিহীন ডামি অ্যাসেম্বলি) দিয়ে সফলভাবে পরীক্ষা ও মহড়া চালানো হয় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। তার আগের বছর নভেম্বরে প্রথম ইউনিটের জন্য ইউরেনিয়ামের চালান বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়। ফুয়েল লোডিংয়ের সময় রিঅ্যাক্টরের ভেতরের অংশ বা রিঅ্যাক্টর ভ্যাসেল পানিতে পূর্ণ রাখা হয়, কারণ পানি বিকিরণ প্রতিরোধে সহায়তা করে। রিফুয়েলিং মেশিনের সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি একে একে রিঅ্যাক্টর কোরের ভেতর নির্ধারিত স্থানে বসানো হবে। প্রতিটি অ্যাসেম্বলি কোথায় বসবে, তা আগেই নির্ধারিত থাকে। এই বিন্যাস বা কোর কনফিগারেশন খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি রিঅ্যাক্টরের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নির্ধারণ করে।
ফুয়েল বসানোর পর কন্ট্রোল রড (যা ফিশন রিয়্যাকশন নিয়ন্ত্রণ করে) সঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা পরীক্ষা করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে।
১৬৩টি অ্যাসেম্বলি রিঅ্যাক্টর কোরে সফলভাবে লোড করার পর কেন্দ্রটিকে ‘মিনিমাম নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতায়’ আনা হবে। এই পর্যায়টিকে ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি বলা হয়, যেখান থেকে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হবে।
প্রকল্পের প্রযুক্তিগত দিক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শৌকত আকবর বলেন, প্রতিটি অ্যাসেম্বলি চার দশমিক ছয় মিটার বা ১৫ ফুট দীর্ঘ, ওজন প্রায় ৭৫০ কেজি। প্রতিটি অ্যাসেম্বলিতে প্রায় ৫৩৪ কেজি ফুয়েল ব্যবহার করা হয়।
রিঅ্যাক্টরে ব্যবহৃত প্রতিটি ইউরেনিয়াম পেলেটের ওজন মাত্র সাড়ে চার থেকে পাঁচ গ্রাম হলেও এর শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা অবিশ্বাস্য। একটি মাত্র পেলেট থেকে প্রায় একটন কয়লার সমপরিমাণ শক্তি পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, এই পেলেটগুলো কোনো বিষাক্ত ধোঁয়া বা কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই একটি সাধারণ পরিবারের কয়েক মাসের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সক্ষম।
জ্বালানি লোডিংয়ের পুরো প্রক্রিয়াটিতে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করা হচ্ছে। বিশেষায়িত ফুয়েল লোডিং মেশিন ব্যবহার করে একে একে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি কোরে বসানো হবে বলে জানান তিনি। এই সময় পুরো সিস্টেমটি ‘সাব-ক্রিটিক্যাল’ অবস্থায় থাকবে এবং সার্বক্ষণিক নিউট্রন মনিটরিং সিস্টেম চালু থাকবে যাতে কোনো প্রকার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে।
দীর্ঘ যাত্রাপথ: বাংলাদেশে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ভাবনা ১৯৬১ সালে শুরু হয়েছিল। তবে ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এ বিষয়ে সক্রিয়তা দৃশ্যমান হয়।
২০১৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাশিয়া সফরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি চূড়ান্ত করে দুই দেশের সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর রোসাটমের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এতমস্ত্রয় এক্সপোর্টের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশের পরমাণু শক্তি কমিশন। তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ২০১৭ সালের অক্টোবরে। সে বছর নভেম্বরে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লি ও পানি শীতলকারী ডোমের কংক্রিট ঢালাই কাজ শুরু হয়। পরের বছর জুলাইয়ে শুরু হয় দ্বিতীয় চুল্লির নির্মাণ কাজ। কাজ শুরুর ৬৮ মাসের মধ্যে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল স্থাপনা নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল।
সে অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয় সরকারের তরফে। আর পরের বছর সমান ক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিট চালু হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। প্রায় পাঁচ বছরে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মহামারী, ইউক্রেইন যুদ্ধসহ নানা কারণে কাজ পিছিয়ে ফুয়েল লোডিংয়েই লেগে গেল প্রায় নয় বছর। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এটি হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র। কেন্দ্রটির মেয়াদ হবে ৬০ বছর। পরে তা আরো ২০ বছর তা বাড়ানো যাবে। প্রকল্পের বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য থাকছে ছয়টি সঞ্চালন লাইন। রূপপুর প্রকল্প চালুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হবে।
সানা/আপ্র/২৮/৪/২০২৬