ফুটবলের মহারণ শুরু হওয়ার আগেই টরন্টোর আকাশে নেমে এলো উৎসবের আবহ। আলো, সুর, নৃত্য, সংস্কৃতি আর হাজারো কণ্ঠের উচ্ছ্বাসে বিশ্বকাপকে বরণ করে নিল কানাডা। উত্তর আমেরিকার হিমেল বাতাস আর গ্যালারিভর্তি দর্শকের উন্মাদনা মিলেমিশে তৈরি করল এমন এক আবেগঘন পরিবেশ, যা শুধু একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নয়, বরং ছিল একটি জাতির দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের উদযাপন।
মেক্সিকোয় বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর একদিন পর শুক্রবার (১২ জুন) টরন্টোর বিএমও ফিল্ডে অনুষ্ঠিত হলো কানাডা পর্বের উদ্বোধনী আয়োজন। স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টা, বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টায় শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠান ছিল সুর, ঐতিহ্য, বৈচিত্র্য ও আধুনিকতার এক অনন্য সম্মিলন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিজেদের মাটিতে পুরুষ ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজন করছে কানাডা। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে ঘিরে দেশজুড়ে যে আবেগ, তারই প্রাণবন্ত প্রতিফলন দেখা গেল টরন্টোর এই উৎসবমুখর রাতে।
৪৩ হাজারের বেশি দর্শকে পূর্ণ স্টেডিয়াম তখন রূপ নিয়েছে এক বিশাল সাংস্কৃতিক মঞ্চে। স্টেডিয়ামের শব্দযন্ত্রে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ফ্যাটবয় স্লিমের বিখ্যাত গানের রিমিক্স বেজে উঠতেই গ্যালারিজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনার ঢেউ। দর্শকদের করতালি, উল্লাস আর পতাকার রঙে মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পায় বিশ্বকাপের আরেকটি আয়োজক শহর।
তবে উৎসবের শুরুটা হয়েছিল কানাডার শিকড়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে। দেশটির প্রথম অধিবাসী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে সামনে রেখে উদ্বোধনী আয়োজনের সূচনা করা হয়। আদিবাসী বংশোদ্ভূত কানাডীয় শিল্পী উইলিয়াম প্রিন্স ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তার চারপাশে রঙিন পোশাকে সজ্জিত শিল্পীদের নৃত্য যেন তুলে ধরে কানাডার মাটি, মানুষ ও ইতিহাসের গল্প। সুরের মূর্ছনা আর ঐতিহ্যের আবহে পুরো স্টেডিয়াম মুহূর্তেই হয়ে ওঠে আবেগে মোড়া এক মিলনমেলা।
ঐতিহ্যের আবহ পেরিয়ে অনুষ্ঠান প্রবেশ করে আধুনিকতার ঝলমলে পর্বে। লাল ট্র্যাকস্যুট পরিহিত নৃত্যশিল্পীদের প্রাণবন্ত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে মঞ্চে আসেন জনপ্রিয় কানাডীয় পপ তারকা অ্যালেসিয়া কারা। তার কণ্ঠে প্রাণ ফিরে পায় স্টেডিয়াম। একইসঙ্গে আলোকসজ্জা ও ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনায় তুলে ধরা হয় কানাডার বন্যপ্রাণী, প্রকৃতি এবং দেশটির দশটি প্রদেশের বৈচিত্র্যময় পরিচয়।
তবে রাতের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ নোরা ফাতেহি। টরন্টোতে জন্ম নেওয়া মরক্কান বংশোদ্ভূত এই তারকা শিল্পী ঘরের শহরে বিশ্বকাপের মঞ্চে উঠে যেন নতুন করে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে দেন। বিশ্বকাপের অফিশিয়াল গান ‘সির সির’ পরিবেশনের সময় দর্শকদের উচ্ছ্বাস ছাপিয়ে যায় স্টেডিয়ামের সীমানাও। তার সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশি-আমেরিকান ডিজে ও সংগীত প্রযোজক সঞ্জয় দেব এবং ফরাসি শিল্পী ভেজেড্রিম। ড্রামের তালে তালে, আলো-ছায়ার মুগ্ধকর খেলায় এবং আধুনিক সুরের উচ্ছ্বাসে তাদের পরিবেশনা পরিণত হয় রাতের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্তে।
বিশেষভাবে আলোচনায় ছিল সঞ্জয় দেবের উপস্থিতি। ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই সংগীতশিল্পী একসময় নিজের সৃজনশীল জগৎ গড়ে তুলেছিলেন সীমিত পরিসরে। সেই শিল্পীই এবার বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে কোটি মানুষের সামনে পরিবেশন করলেন অফিসিয়াল গান। বাংলাদেশের সংগীতপ্রেমীদের জন্যও এটি ছিল গর্বের এক উপলক্ষ।
উৎসবের রঙ আরও গাঢ় করেন কানাডীয় শিল্পী জেসি রেয়েজ এবং ফিলিস্তিনি শিল্পী এলিয়ানা। তারা পরিবেশন করেন বিশ্বকাপের আরেকটি অফিসিয়াল গান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বখ্যাত জ্যাজ-পপ শিল্পী মাইকেল বুবলে। তার উপস্থিতি যেমন দর্শকদের উচ্ছ্বসিত করেছে, তেমনি বিশ্বকাপ দূত হিসেবে মঞ্চে এসে অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন অভিনেতা ও কৌতুকশিল্পী উইল আর্নেট।
অনুষ্ঠানের শেষভাগে আবেগ ছুঁয়ে যায় অন্য উচ্চতায়। কিংবদন্তি শিল্পী অ্যালানিস মরিসেট পরিবেশন করেন কানাডার জাতীয় সংগীত। অন্যদিকে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জাতীয় সংগীত গেয়ে শোনান আলেকসান্দার গাজিক। হাজারো দর্শক তখন দাঁড়িয়ে সম্মান জানাচ্ছেন দুই দেশের পতাকা ও জাতীয় সংগীতকে।
আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও উৎসবের আবেশ কাটেনি। স্টেডিয়ামজুড়ে বেজে ওঠে জনপ্রিয় রক সংগীতের সুর, আর গ্যালারির হাজারো কণ্ঠ একসঙ্গে গেয়ে ওঠে সেই গান। মুহূর্তটি যেন ফুটবলকে ছাড়িয়ে বিশ্বজনীন এক মিলনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
এরপরই শুরু হয় মাঠের আসল লড়াই। স্বাগতিক কানাডা মুখোমুখি হয় বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার। নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলতে নামা কানাডার জন্য এটি ছিল শুধুই একটি ম্যাচ নয়, বরং বহু বছরের স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত।
বিশ্বকাপের আয়োজক তিন দেশের অন্যতম কানাডার টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিত হবে আসরের ম্যাচগুলো। বিশ্বকাপ উপলক্ষে নতুন সাজে সজ্জিত করা হয়েছে টরন্টোর বিএমও ফিল্ড। সম্প্রসারণের পর স্টেডিয়ামটির ধারণক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৭৩৬ জনে।
সংগীত, ঐতিহ্য, বৈচিত্র্য, আবেগ ও ফুটবলের এক অপূর্ব মিলনে কানাডার বিশ্বকাপ বরণ অনুষ্ঠান যেন জানিয়ে দিল— মাঠের লড়াই শুরুর আগেই বিশ্বকাপ জিতে নিয়েছে মানুষের হৃদয়। আর টরন্টোর এই উৎসবমুখর রাত বিশ্বকাপ ইতিহাসে থেকে যাবে কানাডার প্রথম বিশ্বকাপ উৎসবের অবিস্মরণীয় স্মারক হয়ে।
সানা/আপ্র/১৩/৬/২০২৬