গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

মেনু

তেলের পরে গ্যাসের লাইন: জ্বালানি সংকটের ভবিষ্যৎ কী

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৪৩ পিএম, ২৭ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২১:৫৮ এএম ২০২৬
তেলের পরে গ্যাসের লাইন: জ্বালানি সংকটের ভবিষ্যৎ কী
ছবি

ছবি সংগৃহীত

আমীন আল রশীদ    

জ্বালানি তেলের পরে এবার সিএনজি স্টেশনেও যানবাহনের দীর্ঘ সারি। জ্বালানি তেলের সংকটের পেছনে ইরান যুদ্ধ তথা মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে দায়ী করা হলেও তেলের দাম বাড়ানোর পরদিনই পাম্পের আশপাশ থেকে যানবাহনের লাইন উধাও হয়ে গিয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছে, এবার সিএনজি স্টেশনে যানবাহনের লাইনের পেছনেও গ্যাসের দাম বাড়ানো বা অন্য কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে কি না। কেননা ঘরপোড়ার মধ্যে কীভাবে আলু পোড়া দিয়ে খেতে হয়, সেটি আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা খুব ভালো জানেন। অর্থাৎ যে কোনো সংকটকে তারা মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।

অনেক সময় তারা রাতারাতি মোটা অঙ্কের বাড়তি মুনাফা তুলে নিতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিতেও সিদ্ধহস্ত। চলমান গ্যাস সংকটের পেছনে এরকম ‘ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া’ কিংবা গ্যাসের দাম বাড়াতে সরকারের কোনো দূরভিসন্ধি আছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কেননা রোববার বিবিসি বাংলার একটি খবরেও বলা হয়েছে, চলমান সংকটের মধ্যেই সিএনজি বিক্রিতে কমিশন বাড়ানোর দাবিতে ধর্মঘটে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, বেশির ভাগ পাম্পেই গ্যাসের চাপ নেই। যেখানে আছে, সেখানে লম্বা লাইন। অনেক সময় যানবাহনগুলো ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা অপেক্ষার পর গ্যাস পাচ্ছে। সপ্তাহজুড়ে গ্যাস স্টেশনগুলোতে চরম ভোগান্তির কারণে অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছেন, এমন খবরও এসেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি তেলের সংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ায় রাজশাহীর বিভিন্ন পেট্রলপাম্পে মোটরসাইকেল চালকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। যদিও তেলের প্রকৃত কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছে পাম্প মালিক সমিতি ও জেলা প্রশাসন। অর্থাৎ যে কোনো সংকটে একটা হুজুগ তৈরি হয়—যেখানে বড় ভূমিকা রাখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বর্তমান বাংলাদেশের এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বড় উৎপাত। শুধু সিএনজি স্টেশন নয়, বাসাবাড়িতেও গ্যাস সংকট চরমে পৌঁছেছে। রাজধানীর বিভিন্ন মেসে রান্না বন্ধ। ভরসা এখন রেস্টুরেন্ট। কিন্তু প্রতিদিন তিন বেলা রেস্টুরেন্টে খাওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা কতজনের আছে, সেটি যেমন প্রশ্ন, তেমনি টানা রেস্টুরেন্টের অস্বাস্থ্যকর খাবার স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করছে।

বাসাবাড়িতে বিকল্প উপায়ে ইলেকট্রিক চুলায় রান্না হচ্ছে। ফলে আগামী মাসে তাদের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল দিতে হবে। কিন্তু লাইনে গ্যাস না থাকলেও মাস শেষে গ্যাসের বিলে কোনো মাফ নেই। মওকুফ নেই। অর্থাৎ যারা দুই চুলা ব্যবহার করেন, লাইনে গ্যাস থাকুক বা না থাকুক, তাদের মাস শেষে ১ হাজার ৮০ টাকা বিল ঠিকই দিতে হয়। উল্টো আগামী মাসে তাদের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল দিতে হবে। রেস্টুরেন্টের খাবারের পেছনে বাড়তি খরচ করতে হয়। এই বাড়তি খরচ কে জোগাবে? সরকার কি লাইনে গ্যাসের চাপ নেই বলে বিল মাফ করে দেবে? সাম্প্রতিক সংকটের কারণ হিসেবে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটে কারিগরি ত্রুটির কথা বলছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। গত বুধবার সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে দুই-তিন দিনের মধ্যে সমস্যা সমাধানের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সংকট কাটেনি। উপরন্তু রোববার সমকালের একটি খবরে বলা হয়েছে, গ্যাস সংকট থাকবে আরো দুই সপ্তাহ।

প্রশ্ন হলো, এই সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি আরও কতা খারাপ হবে? সাধারণ মানুষের ওপর কী পরিমাণ আর্থিক চাপ পড়বে? তার চেয়ে বড় কথা, গ্যাস সংকট থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হবে। সে ক্ষেত্রে লোডশেডিং বাড়বে কি না এবং এই তীব্র গরমে জনজীবন আরও অতিষ্ঠ হবে কি না; শিল্প-কারখানায় প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা না গেলে সেখানে উৎপাদন ব্যাহত হবে কি না—এমন প্রশ্নও জনমনে আছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ীদেশে ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ সক্ষমতা সব মিলিয়ে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার বাকি অংশের জোগান আসে বিদেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে। যে কারণে আমদানিকৃত এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সাম্প্রতিক সংকট তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের মাটির নিচে যে গ্যাস আছে, সেটি প্রমাণিত। গভীর সমুদ্রেও গ্যাস আছে, সেটিও বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিন্তু নতুন স্থলভাগ ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে তেমন কোনো কাজ হয়নি। বছরের পর বছর এই খাত উপেক্ষিত থেকেছে। এর পেছনে কিছু ব্যবসায়ীর এলএনজি ব্যবসার সুবিধার্থে জ্বালানি খাতকে আমদানিনির্ভর করা হয়েছে- এমন অভিযোগও বেশ পুরোনো। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী সম্প্রতি সংসদে বলেছেন, স্থলভাগ ও সমুদ্র—উভয় এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৮০ দিনের পরিকল্পনা অনুসারে বাংলাদেশের অফশোর ও অনশোর গ্যাস উত্তোলনের জন্য দেশি-বিদেশি কোম্পানিকে আহ্বান জানানো হয়েছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রমের প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান তিনি।

সাধারণত গ্যাস অনুসন্ধানের বৈশ্বিক সাফল্যের হার প্রতি সাতটি কূপে একটি। কিন্তু বাংলাদেশে এ অনুপাত প্রতি তিনটি কূপে একটি। গ্যাস অনুসন্ধানে প্রায় দ্বিগুণ সাফল্যের হার থাকা সত্ত্বেও দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের কাজ সেভাবে শুরু হয়নি। গত ১৫-২০ বছর যদি অব্যাহতভাবে গ্যাস অনুসন্ধান করা হতো, তাহলে অন্তত একটি নতুন ক্ষেত্রও হয়তো আবিষ্কৃত হতে পারত। বাংলাদেশের মাটির নিচে যে গ্যাস রয়েছে, এ কথা প্রমাণিত। বেশি সম্ভাবনার জায়গাতেও গভীর অনুসন্ধান করা হয়নি। সাগরের মীমাংসিত ব্লকে গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সরকার নিজের করা টেন্ডারও বাতিল করেছে।

মনে রাখতে হবে, জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানিনির্ভর হয়ে গেলে উৎপাদন খরচ অনেক বাড়বে। আমদানিনির্ভরতা মানেই হলো ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলা। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, ১০ বছর আগেও বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির পরিমাণ যেখানে ছিল ২৫ শতাংশ, সেটি গত বছর এসে দাঁড়িয়েছে ৬২ শতাংশে। এ বছরের হিসাব পাওয়া গেলে হয়তো দেখা যাবে, এটি ৬৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এভাবে একসময় যদি ৯০ শতাংশ জ্বালানিই আমদানি করতে হয়, তাহলে পুরো জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ চলে যাবে এই খাতে। তখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম আরও বাড়াতে হবে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। সাধারণ মানুষের জীবনযাপন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। সুতরাং জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশের ভেতরে গ্যাসের অনুসন্ধান বাড়ানো, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উন্নয়নের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও মনোযোগ দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে গেলে সরকারের তরফে সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু সিলিন্ডার গ্যাস যে কোনো সমাধান নয়, বরং এটি যে কতা ঝুঁকিপূর্ণ, তা এরই মধ্যে অনেক ঘটনায় প্রমাণিত। সুতরাং সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার ও ব্যবসা বাড়ানো তো নয়ই, বরং ধীরে ধীরে এর ব্যবহার কমিয়ে আনাই রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত। যদিও বিভিন্ন সময়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, ধীরে ধীরে তারা পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে চান। অর্থাৎ শতভাগ বাসাবাড়িতেই সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে হবে- যা সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবসায়ীদেরই সুবিধা দেবে। আর মানুষ যখন কোনো একটি সেবা বা পণ্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, তখন সেখানে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ও নৈরাজ্যও বাড়বে। আমাদের দেশের বাজার ও ব্যবসায়ীদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ যে কত দুর্বল, সেটি নতুন করে বলার কিছু নেই। সেজন্য পাইপলাইনের গ্যাসের গ্রাহক কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনা নয়, বরং নিরাপত্তা ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহারই শূন্যে নামিয়ে আনা উচিত। সেজন্য পাইপলাইনের মাধ্যমেই যাতে গ্রাহকেরা সার্বক্ষণিকভাবে তাদের প্রয়োজনীয় গ্যাস পান, সেটির নিশ্চয়তা দিতে হবে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সাধারণ মানুষের জীবন সহজ করা। রাষ্ট্রের সবচেয়ে কম উপার্জনকারী ব্যক্তিটিও যাতে বাজারে গিয়ে নিত্যপণ্য কিনতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস না ফেলেন এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানির মতো সেবা যাতে তিনি বিনা হয়রানিতে ও সর্বনিম্ন খরচে পেতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা।

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/২৭.০৭.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

চুলার আগুন থেকে শিল্পের চাকা- গ্যাস সংকটে বিপন্ন বাংলাদেশ
২৭ জুলাই ২০২৬

চুলার আগুন থেকে শিল্পের চাকা- গ্যাস সংকটে বিপন্ন বাংলাদেশ

ড. হারুন রশীদ    সকালে রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে না। দুপুরে পরিবারের খাবার তৈরি হয়নি...

দাম্পত্য সম্পর্কে মাদকের প্রভাব
২৭ জুলাই ২০২৬

দাম্পত্য সম্পর্কে মাদকের প্রভাব

বিবাহ একটি শরীর বৃত্তিয়-মনো- সামাজিক বন্ধন যা পারস্পরিক বিশ্বাস,  সম্মান, স্বীকৃতি,  সহভাগ...

ঘড়ির কাঁটায় বন্দি জীবন: আমাদের অদৃশ্য সামাজিক সংকট
২৬ জুলাই ২০২৬

ঘড়ির কাঁটায় বন্দি জীবন: আমাদের অদৃশ্য সামাজিক সংকট

ড. মতিউর রহমান    আজকের ব্যস্ত ঢাকায় পরিচিত কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, ‘কেমন আছেন’;...

শিশুখাদ্য ভেজালমুক্ত রাখা চাই
২৬ জুলাই ২০২৬

শিশুখাদ্য ভেজালমুক্ত রাখা চাই

মোহাম্মদ ইয়াছিনপ্রত্যেক শিশু তার মা-বাবার কাছে পরম আদরের। নিজের রক্তকণিকাকে সুস্থ ও সুন্দরভাবে বাঁচি...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই