দক্ষিণ-পূর্ব ভারত মহাসাগরের তলদেশে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে প্রাচীন ও গভীরতম তিমির সমাধিক্ষেত্রের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাত কিলোমিটারেরও বেশি গভীরে অবস্থিত এ রহস্যময় স্থানে প্রায় ৫০ লাখ বছরের পুরোনো তিমির জীবাশ্মের পাশাপাশি পচনশীল তিমির কঙ্কালকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বৈচিত্র্যময় প্রাণীকুলেরও খোঁজ মিলেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রের তলদেশে মৃত তিমির দেহ তলিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘হোয়েল ফল’ বলা হয়। এমন ঘটনা সাধারণ হলেও এর আগে আবিষ্কৃত অধিকাংশ তিমির দেহাবশেষ চার কিলোমিটারের কম গভীরতায় পাওয়া গেছে। নতুন আবিষ্কৃত সমাধিক্ষেত্রটি সাত কিলোমিটারেরও বেশি গভীরে অবস্থিত এবং শত শত মাইলজুড়ে বিস্তৃত সমুদ্রতল এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে।
গবেষকদের মতে, সেখানে থাকা পচনশীল তিমির কঙ্কালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল প্রাণবৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র। গবেষণার সহ-লেখক ইতালির পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জিওভানি বিয়ানুচ্চি বলেন, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে সমুদ্রের গভীর ও চরম পরিবেশে এমন বহু প্রজাতি ও বাস্তুতন্ত্র রয়েছে, যা এখনো বিজ্ঞানের কাছে অজানা। একই সঙ্গে এটি দেখায়, আলোহীন ও প্রচণ্ড চাপপূর্ণ পরিবেশেও জীবন কীভাবে টিকে থাকে এবং বিকশিত হয়। গবেষণাটি রহস্যময় চঞ্চুওয়ালা তিমি সম্পর্কেও নতুন তথ্য দিয়েছে।
গবেষণার ভিত্তিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালভার্ট মেরিন মিউজিয়ামের স্টিফেন জে গডফ্রি এ আবিষ্কারকে ‘অনন্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, ভবিষ্যতে এ স্থান থেকে আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সন্ধান মিলতে পারে। গবেষণাটি তাকে কোনো মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র সিরিজের প্রথম পর্বের ট্রেইলারের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চীন, ইতালি ও নিউজিল্যান্ডের গবেষকদের একটি দল সাবমার্সিবল ব্যবহার করে দক্ষিণ-পূর্ব ভারত মহাসাগরের খাড়াই ও খাঁজকাটা অঞ্চল ডায়াম্যান্টিনা ফ্র্যাকচার জোনে অনুসন্ধান চালান। প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি বছর আগে অস্ট্রেলিয়া ও অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় এ অঞ্চলটির সৃষ্টি হয়।
বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, ডায়াম্যান্টিনা ফ্র্যাকচার জোনের গভীরতম অংশের কাছাকাছি সাত হাজার দুই মিটার গভীরতায় তিমির জীবাশ্মগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়। পরে সমুদ্রতলে ৩২ বার অভিযান চালিয়ে গবেষকরা ৪৮৫টি তিমির দেহাবশেষ শনাক্ত করেন। পাশাপাশি আধুনিক সময়ের আরো পাঁচটি মৃত তিমির কঙ্কালও পাওয়া যায়, যেগুলো পচনের শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
গবেষকদের ভাষ্য, উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব অক্ষ বরাবর প্রায় এক হাজার ২০০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এই মৃত তিমির সারি সম্ভবত ‘হোয়েল-ফল কমিউনিটি সুপারকোরিডোর’ বা তিমি-পতনের একটি বিশাল সংযোগপথ তৈরি করেছে, যা এর আগে নজরে আসেনি।
আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় কঙ্কালটি ছিল অ্যান্টার্কটিক মিঙ্কে তিমির, যার দৈর্ঘ্য প্রায় পাঁচ মিটার। গবেষকরা প্রায় ৫৩ লাখ বছর পুরোনো ‘টেরোসেটাস বেঙ্গুয়েলে’ নামের চঞ্চুওয়ালা তিমির মাথার খুলির জীবাশ্মও খুঁজে পেয়েছেন। এছাড়া সম্পূর্ণ নতুন একটি তিমি প্রজাতির জীবাশ্ম খুলি শনাক্ত করে এর নাম রাখা হয়েছে ‘টেরোসেটাস ডায়াম্যান্টিন’।
সমুদ্রতলের এসব পচনশীল তিমির দেহকে কেন্দ্র করে কাঁকড়া ও চিংড়িজাতীয় প্রাণী, শামুক-ঝিনুক, হাড়খেকো কৃমি এবং ব্রিটল স্টারসহ অসংখ্য প্রাণীর আবাস গড়ে উঠেছে। গবেষকদের ধারণা, এদের অনেকগুলোই বিজ্ঞানের কাছে সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতি হতে পারে।
সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র অন্বেষণ ও বিজ্ঞান যোগাযোগ বিষয়ের অধ্যাপক জন কপলি বলেন, এটি শুধু বিশ্বের গভীরতম হোয়েল-ফল কলোনিই নয়, একই স্থানে বর্তমান ও প্রাচীন যুগের তিমির জীবাশ্মের এমন সমাহারও অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
তার মতে, এসব মৃত তিমি গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের জন্য দ্বীপের মতো আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করেছে। সমুদ্রতলের উষ্ণপ্রসবণ এলাকার কাছাকাছি বসবাসকারী প্রাণীদের অনেক আত্মীয় প্রজাতিও এসব তিমির অবশিষ্টাংশকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে টিকে আছে।
তবে কপলি বলেন, সমুদ্রতলের গরম পানির ঝরনার মতো দূর থেকে প্রযুক্তির সাহায্যে হোয়েল-ফল শনাক্ত করা যায় না। ফলে এমন সমাধিক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৮০০টি কঙ্কাল নিয়ে গঠিত এই সমাধিক্ষেত্র গবেষকদের জন্য বড় এক ধাঁধা হয়ে উঠেছে।
কারণ, এখানে যেমন অগভীর পানিতে বিচরণকারী ও ছাঁকন পদ্ধতিতে খাদ্যগ্রহণকারী মিঙ্কে তিমির কঙ্কাল রয়েছে, তেমনি গভীর সমুদ্রের শিকারি চঞ্চুওয়ালা তিমির হাড় ও জীবাশ্মও পাওয়া গেছে।
গবেষকদের ধারণা, সমাধিক্ষেত্রটি সম্ভবত ছাঁকন পদ্ধতিতে খাদ্যগ্রহণকারী তিমিদের অভিবাসনপথের ওপর অবস্থিত। একই সঙ্গে এটি শিকারি তিমিদের জন্য গভীর সমুদ্রে স্কুইড শিকারের উপযুক্ত এলাকা। তবে সমুদ্রতলের গভীর ফাটল ও খাঁজে নেমে শিকার করতে গিয়ে তারা নিজেদের শারীরিক সক্ষমতার ঝুঁকিপূর্ণ সীমায় পৌঁছে যেত, যা তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকতে পারে। সূত্র: গার্ডিয়ান
সানা/আপ্র/১৩/৬/২০২৬