একসময় কারখানায় যন্ত্রের আগমন নিয়ে ভয় ছিল—যন্ত্র মানুষের কাজ কেড়ে নেবে। পরে কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির বিস্তার নিয়েও একই প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু প্রতিবারই দেখা গেছে, কিছু পুরোনো কাজ হারিয়ে গেলেও নতুন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এবার সেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্ব। কারণ এবার প্রতিযোগিতা শুধু মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের নয়; বরং মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের সঙ্গেও পাল্লা দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত সমন্বয় করে লেখা এই বিশ্লেষণ প্রতিবেদন।
মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এআই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে এটি শুধু তথ্য খোঁজা বা সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন এআই প্রতিবেদন লিখতে পারে, ছবি ও ভিডিও তৈরি করতে পারে, সফটওয়্যার কোড লিখতে পারে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে সহায়তা করতে পারে এবং একাধিক কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে। ফলে বিশ্বের চাকরির বাজারে তৈরি হয়েছে নতুন এক অনিশ্চয়তা—এআই কি মানুষের কর্মসংস্থান কমিয়ে দেবে, নাকি মানুষের কাজের ধরনই বদলে দেবে?
বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে এআইকে ভবিষ্যতের প্রধান প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। গরপৎড়ংড়ভঃ, এড়ড়মষব, অসধুড়হ, গবঃধ চষধঃভড়ৎসংসহ বিশ্বের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো এআই গবেষণা ও অবকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। তাদের লক্ষ্য শুধু কর্মীদের সহায়তা করা নয়; বরং এমন এআই ব্যবস্থা তৈরি করা, যা জটিল অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে।
কর্মী নয়, এআই এজেন্টের দিকে ঝুঁকছে প্রতিষ্ঠান
বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশ্বের বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যে এখন একটি নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—নতুন কর্মী নিয়োগের পরিবর্তে নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনে এআই এজেন্ট ব্যবহারের চিন্তা। অর্থাৎ ভবিষ্যতের অফিসে একজন কর্মীর পাশে হয়তো থাকবে এক বা একাধিক ভার্চ্যুয়াল সহকারী, যারা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, প্রতিবেদন তৈরি কিংবা যোগাযোগের মতো কাজ করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে কম দক্ষতা বা প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরিগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে।
রোবট ও মানুষের পাশাপাশি কাজ করার প্রতীকী দৃশ্য -ছবি এআই
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা বলছে, এআইয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে সেইসব কাজে, যেখানে নিয়মভিত্তিক তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, বিশ্লেষণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে এসব পেশা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে; বরং কাজের ধরন ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হবে।
কোন চাকরি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে—
* সফটওয়্যার উন্নয়নের কিছু প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ;
* তথ্য বিশ্লেষণ;
* হিসাবরক্ষণ;
* ব্যাংকিংয়ের কিছু নিয়মিত কাজ;
* গ্রাহকসেবা;
* টেলিমার্কেটিং;
* আইনি সহকারী পর্যায়ের কাজ;
* অনুবাদ;
* সাধারণ লেখালেখি ও কনটেন্ট তৈরির কাজ।
বিশেষ করে নতুন কর্মীদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানে একজন অভিজ্ঞ কর্মীকে সহায়তা করার জন্য যে পরিমাণ জুনিয়র কর্মী প্রয়োজন হতো, এআইয়ের কারণে ভবিষ্যতে সেই সংখ্যা কমে যেতে পারে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চ্যাটজিপিটির ব্যাপক ব্যবহারের পর ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের কর্মসংস্থানে কিছু খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু এআই নয়; বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় কমানোর নীতিও এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
সব চাকরিই কি ঝুঁকিতে?
এর উত্তর হলো—না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব পেশায় মানুষের আবেগ, সহানুভূতি, শারীরিক উপস্থিতি এবং জটিল মানবিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, সেসব কাজে এআইয়ের প্রভাব তুলনামূলক কম হবে।
স্বাস্থ্যসেবা, নার্সিং, শিক্ষকতা, শিশু পরিচর্যা, দক্ষ কারিগরি কাজ, নেতৃত্ব, ব্যবস্থাপনা, গবেষণা এবং সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত পেশাগুলোতে মানুষের ভূমিকা দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
কারণ এআই তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু একজন চিকিৎসকের মতো রোগীর ভয় বুঝতে পারে না। এআই পাঠ তৈরি করতে পারে, কিন্তু একজন শিক্ষকের মতো শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা সব সময় বুঝতে পারে না। প্রযুক্তি সিদ্ধান্তে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু মানবিক বিচারবোধের বিকল্প হওয়া এখনও কঠিন।
চাকরির বিজ্ঞাপনেও পরিবর্তনের সংকেত
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনলাইন চাকরির বাজারেও এআইয়ের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এআইয়ের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত কিছু খাতে চাকরির বিজ্ঞাপনের ধরনে পরিবর্তন এসেছে।
অন্যদিকে এআই ব্যবহারে দক্ষ কর্মীদের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। অর্থাৎ চাকরি পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছে—এমন নয়; বরং চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার মানদণ্ড বদলে যাচ্ছে।
ভবিষ্যতের কর্মীকে শুধু একটি নির্দিষ্ট কাজ জানলেই হবে না। তাকে জানতে হবে কীভাবে এআইকে কাজে লাগিয়ে নিজের দক্ষতা বাড়ানো যায়।
এআই কি মানুষের বিকল্প, নাকি সহযোগী?
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করেন, এআই মানুষের বিকল্প নয়; বরং মানুষের ক্ষমতা বৃদ্ধির একটি হাতিয়ার হতে পারে।
যেমন একজন সাংবাদিক এআই ব্যবহার করে দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারেন, একজন চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ে সহায়তা নিতে পারেন, একজন প্রকৌশলী নকশা তৈরিতে সময় কমাতে পারেন।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু খরচ কমানোর জন্য কর্মী কমিয়ে এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
অনেক অর্থনীতিবিদ সতর্ক করেছেন, যদি এআইয়ের কারণে ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থান কমে যায় এবং মানুষের আয় কমতে থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?
এআইয়ের এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী এখন চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে। তৈরি পোশাক, ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি, গণমাধ্যম, শিক্ষা, প্রশাসন—প্রায় সব ক্ষেত্রেই আগামী দিনে এআইয়ের প্রভাব পড়বে।
ছবি এআই
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে তা ব্যবহারের দক্ষতা অর্জন করা।
শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নয়; ভবিষ্যতে প্রয়োজন হবে—
* প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা;
* তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা;
* সৃজনশীল চিন্তা;
* সমস্যা সমাধানের দক্ষতা;
* যোগাযোগ ও নেতৃত্বের ক্ষমতা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে কর্মী এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখবেন, তিনি পিছিয়ে পড়তে পারেন। আর যিনি এআইকে সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন, তিনিই ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে এগিয়ে থাকবেন।
শেষ কথা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চাকরির পৃথিবীতে বড় পরিবর্তন আনছে—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ইতিহাস বলছে, প্রযুক্তির প্রতিটি বড় পরিবর্তন একই সঙ্গে সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে আসে।
এআই হয়তো কিছু পুরোনো কাজ কমিয়ে দেবে, কিছু চাকরির ধরন বদলে দেবে। কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি করবে নতুন দক্ষতা, নতুন পেশা এবং নতুন সুযোগ।
প্রশ্ন তাই শুধু এটি নয়—**এআই মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে কি না। বরং বড় প্রশ্ন হলো, এআইয়ের যুগে মানুষ কত দ্রুত নিজেকে নতুন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত করতে পারবে।
কারণ ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা হবে মানুষ বনাম এআই নয়; বরং **এআই ব্যবহার করতে পারা মানুষ বনাম এআই ব্যবহার করতে না পারা মানুষ।
সানা/আপ্র/২৪/৭/২০২৬