কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে নতুন করে বিস্তৃত আইন না করে প্রযুক্তিটির কারণে তৈরি হওয়া নির্দিষ্ট নতুন পরিস্থিতি নিয়ে নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা মাইকেল ক্র্যাটসিওস বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য একেবারে নতুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরির পরিবর্তে প্রযুক্তিটির সঙ্গে যুক্ত নতুন ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় নীতিমালা তৈরিতে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনায় শিল্প খাতের শীর্ষ ব্যক্তি ও বাণিজ্যমন্ত্রীদের নিয়ে আয়োজিত জি২০ বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে অংশ নেওয়া দেশগুলোর প্রতি ‘ক্যারোলাইনা নীতিমালা’ গ্রহণের আহ্বানও জানান ক্র্যাটসিওস।
তিনি বলেন, নীতিনির্ধারকদের প্রতিটি উদ্ভাবনকে আলাদাভাবে বিবেচনা করার প্রয়োজন নেই। প্রতিটি নতুন প্রযুক্তিকেও একেবারে নতুন ধরনের নীতিগত সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
ক্র্যাটসিওস জানান, চীন সরকারও ওই নীতিমালায় সই করেছে। তবে তিনি নথিটির কোনো কপি সাংবাদিকদের দেননি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চীনা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অবস্থানের সঙ্গেও মিল: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের এ অবস্থান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অনেকগুলোর অবস্থানের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব কোম্পানির প্রায় সবই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক। দ্রুত সম্প্রসারিত ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ কম রাখা অথবা নতুন নীতিমালা প্রণয়নের সময় নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী প্রভাব বিস্তার—দুই ক্ষেত্রেই তারা সক্রিয়।
সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের মুনাফায় প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন মডেল তৈরির গতি কমে গেলে কিংবা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে কোম্পানিগুলোকে পণ্যের কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে হলে ব্যবসায়িক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
বৈঠকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিত্ব করেন প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানমন্ত্রী ইন হেজুন। ক্র্যাটসিওস সাংবাদিকদের বলেন, চীনা প্রতিনিধির সঙ্গে তাঁর ‘দারুণ’ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে।
প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদেরও অংশগ্রহণ: দুই দিনের এই বৈঠকে বিশ্বের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শীর্ষ ব্যক্তিরাও বক্তব্য দেন। বুধবার অ্যানথ্রপিকের সহপ্রতিষ্ঠাতা টম ব্রাউন বক্তব্য দেবেন বলে কোম্পানিটির এক মুখপাত্র জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার ভিডিওর মাধ্যমে বক্তব্য দেন গুগল ডিপমাইন্ডের ডেমিস হাসাবিস, মেটার মার্ক জাকারবার্গ এবং স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক।
হাসাবিস জি২০ কর্মকর্তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার জন্য নিরাপত্তা পরীক্ষা চালুর আহ্বান জানান।
জাকারবার্গ বলেন, দেশগুলোর উন্মুক্ত-উপাদানভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা উচিত নয়। এসব মডেলের মূল উপাদান সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের মডেলের ক্ষেত্রে নেতৃত্বস্থানীয় অবস্থানে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে বিধিনিষেধ তাঁর সেই প্রচেষ্টায় প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের সমালোচনা করেন ইলন মাস্ক। তাঁর দাবি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি কোম্পানিগুলোর অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। চীনের বাইরে অন্য দেশগুলোর নেতাদের তথ্যকেন্দ্র পরিচালনার জন্য নতুন জ্বালানি উৎস তৈরির আহ্বানও জানান তিনি।
তথ্যকেন্দ্র নিয়েও বাড়ছে বিতর্ক: যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ ও এর বিপুল বিদ্যুৎ চাহিদা এখন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে। তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে প্রার্থীদের অবস্থান ভোটারদের মনোভাবেও প্রভাব ফেলছে।
জাতিসংঘের একটি প্যানেল সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়া ও সরকারি নীতির চেয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান হাগিং ফেইসের অবকাঠামোয় অননুমোদিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এজেন্টের অনুপ্রবেশের মতো ঘটনায় নিজেদের পণ্য কতটা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এজেন্ট এমন এক ধরনের কর্মসূচি, যা মানুষের খুব কম তদারকিতে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে পারে।
চীনের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ ওয়াশিংটনের: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বৈশ্বিক বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই জি২০ বৈঠক হচ্ছে। একই সময়ে এআই খাতে নেতৃত্ব ধরে রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছ থেকে বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে।
চীনের তৈরি উন্মুক্ত-উপাদানভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের মতো বড় কোম্পানির মালিকানাধীন ব্যবস্থার সঙ্গে সক্ষমতার ব্যবধান ক্রমেই কমিয়ে আনছে। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর মধ্যেও এসব চীনা মডেলের ব্যবহার বাড়ছে। চীনা কর্তৃপক্ষ এসব মডেলে হস্তক্ষেপ করলে তা সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির প্রযুক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক ফেলো বিবেক চিলুকুরি বলেন, এ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে—বিশ্বের বাকি দেশগুলো যেন মার্কিন প্রযুক্তিব্যবস্থার মধ্যেই থাকে এবং বিকল্প খোঁজার চেষ্টা না করে।
আগামী কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে জি২০-সংক্রান্ত আরো কয়েকটি বৈঠক হবে। এর ধারাবাহিকতায় ডিসেম্বরে মায়ামিতে জি২০ নেতাদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের সঙ্গে প্রতিনিধিদের সামনে আলাদাভাবে উপস্থিত হওয়ার কথা ছিল ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান ও এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংয়ের।
বৈঠকের বাইরে বিক্ষোভ: বৈঠকের বাইরে নর্থ ক্যারোলাইনায় কয়েকজন বিক্ষোভকারীও জড়ো হন। তাঁদের একজন জন মন্টাভন তথ্যকেন্দ্র নিয়ে ইলন মাস্কের অবস্থানের বিরোধিতা করেন। তাঁর মতে, তথ্যকেন্দ্রগুলোর বিপুল বিদ্যুৎ চাহিদা পৃথিবীকে আরো উষ্ণ করে তুলবে। মন্টাভনের ভাষায়, মাস্কের অবস্থান থেকে বোঝা যায়—বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ যে বাস্তবতার মধ্যে বাস করে, তার সঙ্গে তিনি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।
সানা/ডিসি/আপ্র/২/৮/২০২৬