কিছু বিদায় কেবল একজন মানুষের প্রস্থান নয়, একটি যুগের অবসানের প্রতীক। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা তেমনই এক মুহূর্ত। আকাশি-সাদা জার্সিতে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি যে গল্প লিখেছেন, তার শেষ ম্যাচ হয়ে থাকতে পারে গত জুলাইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনাল; কিন্তু সেই গল্পের শেষ নেই। কারণ কিংবদন্তিরা মাঠ ছাড়েন, মানুষের স্মৃতি থেকে নয়।
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ছিল সাফল্যের সরল পথ নয়। ছিল সংশয়, অপবাদ, পরাজয় আর প্রত্যাশার অসহনীয় চাপ। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরপর পরাজয় তাঁকে একসময় আর্জেন্টিনার অপূর্ণতার প্রতীকে পরিণত করেছিল। এমনকি ২০১৬ সালে অভিমানে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেই শেষ হয়নি মহাকাব্য। বরং শুরু হয়েছিল তাঁর সবচেয়ে মহিমান্বিত প্রত্যাবর্তন।
২০২১ সালে কোপা আমেরিকা দিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। এরপর ফিনালিসিমা, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা—চার বছরে চারটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা। কাতারের বিশ্বকাপ জয় ছিল সেই যাত্রার চূড়ান্ত পূর্ণতা। যে প্রশ্ন তাঁকে বছরের পর বছর তাড়া করেছে—জাতীয় দলের হয়ে তিনি কী জিতেছেন—তার উত্তর তিনি দিয়েছেন বিশ্বকাপের ট্রফি দিয়ে। আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মেসি শুধু নিজের অসম্পূর্ণতা পূরণ করেননি, একটি জাতির দীর্ঘ স্বপ্নও পূর্ণ করেছেন।
এই জায়গাতেই তাঁর সঙ্গে দিয়েগো ম্যারাডোনার তুলনা অনিবার্য। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনা যেমন নিজের প্রতিভা ও নেতৃত্বে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন, মেসিও তেমনি একটি প্রজন্মের স্বপ্নকে বাস্তব করেছেন। তবে তাঁদের সৌন্দর্য আলাদা—ম্যারাডোনার ফুটবলে ছিল বিদ্রোহের আগুন, মেসির খেলায় ছিল নৈঃশব্দ্যের জাদু ও অসাধারণ সৃষ্টিশীলতা।
পেলের সঙ্গে তুলনায়ও মেসির মাহাত্ম্য স্পষ্ট। পেলে ফুটবলকে বিশ্বজনীন জনপ্রিয়তার মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন; মেসি সেই খেলাকে শিল্পের সূক্ষ্মতায় উন্নীত করেছেন। পেলে, ম্যারাডোনা ও মেসি—তিন ভিন্ন যুগের তিন ভিন্ন প্রতিভা। কিন্তু তাঁদের মিল এক জায়গায়: তাঁরা শুধু ফুটবল খেলেননি, ফুটবলপ্রেমীদের কল্পনার জগৎও বদলে দিয়েছেন।
আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল, ছয়টি বিশ্বকাপ এবং আটবারের বর্ষসেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি মেসির পরিসংখ্যানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন সংখ্যার বাইরে। তিনি শিখিয়েছেন, প্রতিভার চেয়েও বড় হলো অধ্যবসায়; পরাজয়ের চেয়েও শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন; আর দীর্ঘ অপেক্ষার পরও স্বপ্ন পূরণ সম্ভব।
শেষ বিশ্বকাপে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছেন মেসি। অথচ তাঁর শেষ ছবিটি পরাজয়ের নয়, উত্তরাধিকারের। নতুন প্রজন্মকে জায়গা করে দেওয়ার সিদ্ধান্তেও রয়েছে এক মহাতারকার পরিণত নেতৃত্ব।
আকাশি-সাদা জার্সিতে আর দেখা যাবে না তাঁর বাঁ পায়ের জাদু। কিন্তু যে শিশু বল পায়ে মাঠে নামবে, যে তরুণ হেরে গিয়েও আবার উঠে দাঁড়াবে, যে দর্শক ফুটবলে সৌন্দর্য খুঁজবে—তাদের স্বপ্নে মেসি থাকবেন।
পেলে ছিলেন ফুটবলের রাজা, ম্যারাডোনা বিদ্রোহী জাদুকর; মেসি শিল্পী। তাঁদের যুগ শেষ হয়েছে, কিন্তু তাঁদের কিংবদন্তি নয়। মেসির অবসরও তাই সমাপ্তি নয়—এ এক মহাকাব্যকে ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী করে দেওয়ার মুহূর্ত।
সানা/আপ্র/২/৯/২০২৬