তীব্র জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও রফতানি আদেশ কমে যাওয়ায় দেশের তৈরি পোশাক খাত গভীর সংকটে পড়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে অধিকাংশ পোশাক কারখানা সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির নেতারা। একই সঙ্গে উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও অর্ডার সংকটে গত তিন বছরে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলেও জানিয়েছেন তারা।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এসব তথ্য তুলে ধরেন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের একটি প্রতিনিধিদল। এ সময় তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান সংকট, রফতানি পরিস্থিতি, বিনিয়োগ ও শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়।
বিজিএমইএ নেতারা রাষ্ট্রপতিকে জানান, জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রফতানি আদেশ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এর সঙ্গে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার ও মজুরি সমন্বয়ের কারণে গত তিন বছরে পোশাক উৎপাদনের ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও রফতানি কমেছে ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগও স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিজিএমইএ নেতারা বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পোশাকশিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। গত তিন বছরে প্রায় ৪০০ কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংকট কাটিয়ে শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে রাষ্ট্রপতির কাছে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন সংগঠনটির নেতারা। গ্যাস সংকট মোকাবিলায় দ্রুত দুটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি মূল্যের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং এলএনজি আমদানির পর্যায়ে শুল্ক-কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে স্বল্প সুদের বিশেষ ঋণ দেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।
অবকাঠামো ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অস্থায়ীভাবে অতিরিক্ত কার্গো শেড নির্মাণ এবং বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ দ্রুত শেষ করে চালুর দাবি জানানো হয়।
ব্যাংকিং খাতে চলতি মূলধন ও বাণিজ্য ঋণের সুদের হার কমানো, পোশাক খাতের জন্য বিশেষ পরবর্তী জাহাজীকরণ অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু এবং জিটিএফ ও টিডিএফ তহবিলে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। ব্যবসা সহজ করার ক্ষেত্রে কাস্টমস বন্ড নিরীক্ষা প্রক্রিয়া সহজ ও প্রাতিষ্ঠানিক করার পাশাপাশি পোশাকশিল্পের কাঁচামাল দ্রুত আমদানির স্বার্থে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানির প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের পোশাক রফতানির বাজার ধরে রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার উদ্যোগ জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অন্যান্য প্রধান বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির উদ্যোগে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়।
এ ছাড়া গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের জন্য আধুনিক হাসপাতাল ও কল্যাণকেন্দ্র নির্মাণে দ্রুত জমি বরাদ্দ এবং ঝুট ব্যবসাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানানো হয়েছে।
বিজিএমইএ নেতাদের বক্তব্য সহানুভূতির সঙ্গে শোনেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি তৈরি পোশাকশিল্পকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান মেরুদণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘সাময়িক প্রতিকূলতা কাটিয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।’
শিল্পের টেকসই বিকাশ ও সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দেন রাষ্ট্রপতি।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করা, বন্ধ ও নিষ্ক্রিয় পোশাক কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন, অনিবন্ধিত বন্ড সুবিধার আওতাবহির্ভূত কারখানায় বন্ডেড কাঁচামাল সংগ্রহ ও সরাসরি রফতানির সুযোগ এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করার মতো সরকারি উদ্যোগের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।
সাক্ষাতে বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান, সহসভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম, সহসভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান, সহসভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান, সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী, সহসভাপতি মোহাম্মদ রফিক চৌধুরীসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সানা/আপ্র/২/৯/২০২৬