কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানে বিশ্বজুড়ে সম্পদ সৃষ্টির গতি বেড়েছে। এর ফলে ২০২৫ সালে বিশ্বে শতকোটিপতির সংখ্যা রেকর্ড ৩ হাজার ৭৯৫ জনে পৌঁছেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে সম্পদবিষয়ক তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান আলট্রাটা।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, এক বছরে বিশ্বে শতকোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে বিশ্বের শতকোটিপতিদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। এতে তাঁদের মোট সম্পদ রেকর্ড ১৫ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন বা ১৫ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
আলট্রাটা জানিয়েছে, শতকোটিপতিদের সম্পদ বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১৫০টি তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত পাঁচ বছরে যেসব কোম্পানি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে অন্তত ৩ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তাদের বাজার মূলধন বৃদ্ধির হার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ না করা কোম্পানিগুলোর তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি ছিল।
ফোর্বস সাময়িকীর সেপ্টেম্বর মাসের শীর্ষ ১০ ধনীর তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ৯ জনই প্রযুক্তি খাতের। তাঁদের অর্ধেকের সম্পদের পরিমাণ ২০০ বিলিয়ন বা ২০ হাজার কোটি ডলারের বেশি।
আলট্রাটার চিন্তানেতৃত্ব ও বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান মায়া ইমবার্গের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ব্যাপক উচ্ছ্বাসের কারণে শতকোটিপতিদের মধ্যে সম্পদের বৈষম্যও বাড়ছে।
প্রতিবেদনে ২৯ জন ‘সুপার শতকোটিপতির’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকের সম্পদের পরিমাণ ৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি। তাঁদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ৪ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের সব শতকোটিপতির মোট সম্পদের ২৭ শতাংশ। ২০১৭ সালে এ ধরনের সুপার শতকোটিপতির সংখ্যা ছিল মাত্র ১০ জন। সে সময় তাঁদের সম্মিলিত সম্পদ ছিল বিশ্বের সব শতকোটিপতির মোট সম্পদের মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ।
ইমবার্গ বলেন, প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে শতকোটিপতিদের সম্পদ বৃদ্ধির হার ঐতিহাসিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারের দাম দ্রুত ওঠানামা করতে পারে। ফলে এ সম্পদে একধরনের অস্থিরতা থেকেই যায়।
ই-মেইলে ইমবার্গ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানির মালিক, অর্থাৎ বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের অনেকের সম্পদের পরিমাণও দ্রুত কমবেশি হতে পারে।
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে বড় চিপ কোম্পানিগুলোর শেয়ারে ধসের কারণে বাজারমূল্য থেকে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার কমে যায়। বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো, তাঁদের কাগুজে সম্পদের মূল্য খুব দ্রুত বিপুল পরিমাণে ওঠানামা করতে পারে।
ফোর্বসের হিসাবে দেখা গেছে, ইলন মাস্কের সম্পদমূল্য এক দিনেই ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার এবং ল্যারি এলিসনের সম্পদ এক সপ্তাহে ৫ হাজার কোটি ডলার কমে গেছে।
ইমবার্গ বলেন, বাজারের কোনো একটি খাত বা কয়েকটি কোম্পানির প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ থাকলেই সেখানে বুদ্বুদ তৈরি হবে—এমন নয়। তবে বিনিয়োগ যখন প্রধানত একটি খাত, বিশেষ করে প্রযুক্তি খাত এবং তার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক কোম্পানিগুলোতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন ঝুঁকি তৈরি হয়।
আলট্রাটার হিসাবে, ২০২৫ সালে উত্তর আমেরিকায় শতকোটিপতির সংখ্যা ১১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৩৩৭ জনে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় এ বৃদ্ধির হার বেশি। ইমবার্গের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
গত বছর ইউরোপে শতকোটিপতির সংখ্যা ৭ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৮১ জনে দাঁড়িয়েছে। এশিয়ায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধির পর শতকোটিপতির সংখ্যা হয়েছে ৮৮১ জন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উচ্ছ্বাস শতকোটিপতিদের সম্পদ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে বিভিন্ন দিক থেকেই ২০২৫ সাল ছিল অস্বাভাবিকভাবে লাভজনক। আলট্রাটা যেসব সম্পদশ্রেণির হিসাব রাখে, ২০২৫ সালে সেগুলোর সব কটিতেই ইতিবাচক ফল এসেছে। করোনা মহামারির পর এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ ঘিরে অস্থিরতার মধ্যেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি খাতের ধনীদের সম্পদ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
সানা/আপ্র/৬/৯/২০২৬