গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির চত্বরে রাম বিগ্রহ নির্মাণকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার মধ্যে নির্মাণকাজ স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ওই বিগ্রহ অপসারণের দাবি জানিয়েছে ইমাম ওলামা পরিষদ। এ নিয়ে এলাকাজুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সংগঠনটি শুক্রবার (১২ জুন) জুমার নামাজের পর উপজেলা সদরের চারমাথা মোড়ে ঢাকা–রংপুর মহাসড়কে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে নির্মাণাধীন বিগ্রহ অপসারণের জন্য সময়সীমা বেঁধে দেয়। একই দাবিতে জেলা সদরসহ অন্যান্য উপজেলাতেও কর্মসূচি পালিত হয়েছে বলে জানানো হয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে উপজেলার মধ্য রামচন্দ্রপুর মন্দির ভবনে সংবাদ সম্মেলন করে মন্দির কমিটির উপদেষ্টা শ্যামল কুমার মহন্ত রাম বিগ্রহ নির্মাণকাজ আপাতত স্থগিত ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ নয়; বরং ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য রক্ষার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। মন্দিরের নিয়মিত ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম চলমান থাকবে বলেও জানান তিনি।
মন্দির চত্বরে রাম বিগ্রহ নির্মাণ শুরুর পর থেকেই এলাকায় নানা আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। মন্দির কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, এটি এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাম বিগ্রহ হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এরপর ইমাম ওলামা পরিষদ ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে নির্মাণ বন্ধের দাবি জানায়।
এ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এড়াতে শুক্রবার সকাল থেকেই পলাশবাড়ী চারমাথা মোড়, কোমরপুর মোড় ও হাসবাড়ী এলাকায় বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
ইমাম ওলামা পরিষদের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার গাইবান্ধা পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তন ও পলাশবাড়ী উপজেলা মডেল মসজিদের হলরুমে পৃথক সংবাদ সম্মেলনে নির্মাণাধীন রাম বিগ্রহ অপসারণসহ আট দফা দাবি জানানো হয়।
সংগঠনের জেলা সেক্রেটারি মুফতি মানছুর রহমান খান লিখিত বক্তব্যে বলেন, জনশ্রুতি অনুযায়ী এটি বিশ্বের বৃহত্তম রাম মূর্তি নির্মাণের উদ্যোগ। এতে স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগ, ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। রংপুর বিভাগের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে এত বড় মন্দির ও রিসোর্ট প্রকল্পকে ঘিরে ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তিনি আরো অভিযোগ করেন, প্রকল্পের উদ্যোক্তা সম্পর্কে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক ও প্রশ্ন রয়েছে। তার বিরুদ্ধে অতীতে অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়টিও তদন্তের দাবি জানান তারা।
আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে— নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ বন্ধ, অর্থায়নের উৎস ও ব্যয় নিরীক্ষা, দেশি-বিদেশি অর্থায়ন ও সম্পৃক্ততার তদন্ত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের উৎস যাচাই, বিদেশি রাষ্ট্র বা সংস্থার প্রভাব আছে কি না তা খতিয়ে দেখা, জাতীয় নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঝুঁকি নিরূপণ, এবং প্রমাণিত অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।
এছাড়া বিদেশি কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলে তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যাচাই এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণেরও দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের জেলা সভাপতি মুফতি মাহমুদুল হাসান কাসেমী, হেফাজতে ইসলাম জেলা সভাপতি মাওলানা আব্দুল বাসেত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জেলা সভাপতি আব্দুল মাজেদ, খেলাফত মজলিস জেলা সভাপতি মুফতি ইউসুফ কাসেমী এবং পলাশবাড়ী ওলামা পরিষদের সভাপতি মাওলানা ছাদেকুল ইসলাম।
অন্যদিকে শুক্রবার দুপুরে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে উপজেলা ইমাম ওলামা পরিষদ। এতে বক্তারা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রাম মূর্তি অপসারণ এবং নির্মাণের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের দাবি জানান। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন সংগঠনের উপজেলা সভাপতি মাওলানা ছাদেকুল ইসলাম, সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম, হেফাজতে ইসলাম উপজেলা শাখার সভাপতি মাওলানা শাহ আলম ফয়েজি, জামায়াতে ইসলামী নেতা ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আবু তালেব মাস্টার, অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা এবং খাইরুল ইসলাম চান।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে এলাকায় উত্তেজনা ও সতর্ক অবস্থান অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
সানা/আপ্র/১৩/৬/২০২৬