গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

মেনু

ঋণনির্ভর লুটপাটের বাজেট, দাবি জামায়াতের

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২:০২ পিএম, ১২ জুন ২০২৬ | আপডেট: ২৩:৩৬ এএম ২০২৬
ঋণনির্ভর লুটপাটের বাজেট, দাবি জামায়াতের
ছবি

শুক্রবার মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বাজেট-পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার -ছবি সংগৃহীত

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে অধিক ঋণনির্ভর, উচ্চাভিলাষী, অবাস্তবায়নযোগ্য এবং লুটপাটের বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করেছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, এ বাজেটে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি; বরং অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা, দুর্বল রাজস্ব কাঠামো ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে এটি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাজেট-পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

তিনি বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটের অর্থায়ন মূলত ব্যাংক ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। বাজেটে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের কথা বলা হলেও তা কীভাবে অর্জন করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। একইভাবে ২ লাখ ৩৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকার ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে, তাও পরিষ্কার নয়। রাজস্ব আহরণের জন্য প্রয়োজনীয় কর কাঠামো ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের বিষয়েও কোনো কার্যকর রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়নি।

গোলাম পরওয়ার বলেন, বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরকার ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়বে, ফলে বিনিয়োগ স্থবির হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাজেট বাস্তবায়নের পথে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। তার ভাষায়, সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বারবার বাড়ানো হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং অর্থনীতির সব খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরো কঠিন করে তুলছে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের ৫৫তম জাতীয় বাজেট হিসেবে জনগণ একটি জনবান্ধব, সুপরিকল্পিত, দূরদর্শী ও বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু ঘোষিত বাজেটে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নের সুস্পষ্ট প্রতিফলন নেই।

তিনি অভিযোগ করেন, কর প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের কোনো প্রতিফলন বাজেটে দেখা যায়নি। সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এ বিপুল বাজেট বাস্তবায়নের সময় দুর্নীতি, অপচয় ও লুটপাটের ঝুঁকি আরো বাড়বে।

বাজেটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলে মন্তব্য করে গোলাম পরওয়ার বলেন, বর্তমান বিনিয়োগ পরিবেশ, দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি ও বৈষম্যমূলক নীতির কারণে উৎপাদনশীলতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ বিভিন্ন সংস্থা আগামী অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। সে বাস্তবতায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তিনি দাবি করেন।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ৩ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করার সমালোচনা করে তিনি বলেন, পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হলে দুর্নীতি ও অপচয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটের বিভিন্ন দিকও তুলে ধরা হয়। গোলাম পরওয়ার জানান, তাদের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা, যেখানে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, যা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হবে বলে তাদের ধারণা।

তিনি বলেন, সরকারের বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা, যেখানে জামায়াতের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। জিডিপির অনুপাতে সরকারের ঘাটতি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হলেও জামায়াতের প্রস্তাবিত ঘাটতি প্রায় ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

জামায়াতের পক্ষ থেকে অর্থবছরের সময়সীমা পরিবর্তনেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান জুলাই-জুন অর্থবছরের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বরভিত্তিক অর্থবছর চালুর পক্ষে মত দিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, জুনে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থবছর শেষ হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করার প্রবণতা দেখা যায়, যা কাজের মান ক্ষুণ্ন করে এবং দুর্নীতির সুযোগ বাড়ায়।

তিনি বলেন, ন্যূনতম ব্যক্তিগত করহার ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এ ধরনের করভার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরো কঠিন করে তুলবে।

অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্প খাতের বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর কর ও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত। দলটির মতে, পেট্রোলিয়াম, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ওপর ভ্যাট বৃদ্ধি জনজীবনে ভোগান্তি বাড়াবে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকশিল্পের কাঁচামালের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি দেশের রপ্তানি খাতের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, অতিমাত্রায় ঋণনির্ভর এ বাজেট দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াবে। পরিচালন ব্যয় ও সুদের বোঝা বেড়ে যাওয়ায় উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরো বলেন, এনবিআরের রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ক্রমবর্ধমান সুদের চাপ মোকাবিলা-এই তিন ক্ষেত্রে সরকারের বড় দুর্বলতা রয়েছে। ফলে বাজেট বাস্তবায়ন উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকিং খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত। গোলাম পরওয়ার বলেন, ব্যাংক রেজোলিউশন আইন, কালো টাকা বিদেশে পাচার, জনগণের অর্থ লুটপাট এবং ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করার নানা উদ্যোগ উদ্বেগজনক। তিনি ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো পরিবর্তনের সমালোচনা করে বলেন, অন্যায়ভাবে যাদের শেয়ার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের শেয়ার পূর্বমূল্যে ফেরত দেওয়া উচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে নৈরাজ্যপূর্ণ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু ব্যাংকিং ব্যবস্থা নয়, পুরো অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে।

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং বাজেটকে দুর্নীতি ও কালো অর্থের প্রভাবমুক্ত করে জনমুখী ও জনকল্যাণমূলক রূপ দিতে হবে। একই সঙ্গে বাজেট পাসের আগে সংসদে যথাযথ আলোচনা, সংশোধনী ও মতামত গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম ও ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মু. আতাউর রহমান সরকার এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আব্দুস সাত্তার সুমন।
সানা/আপ্র/১২/৬/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

২০১৮ সালের নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা ৩২ যুগ্ম সচিব বাধ্যতামূলক অবসরে
২৮ জুলাই ২০২৬

২০১৮ সালের নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা ৩২ যুগ্ম সচিব বাধ্যতামূলক অবসরে

একযোগে ৩২ জন যুগ্ম সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের অধিকাংশই ক্ষমত...

জাতীয় অধ্যাপক হলেন শিক্ষাবিদ মাহবুব উল্লাহ
২৮ জুলাই ২০২৬

জাতীয় অধ্যাপক হলেন শিক্ষাবিদ মাহবুব উল্লাহ

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়ো...

স্বাধীন গণমাধ্যম নীতিমালায় সম্পাদকদের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী
২৮ জুলাই ২০২৬

স্বাধীন গণমাধ্যম নীতিমালায় সম্পাদকদের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

স্বাধীন গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের চলমান প্রক্রিয়ায় সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সহযোগি...

তোমাদের হাতেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ, নতুন কুঁড়ির মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান
২৭ জুলাই ২০২৬

তোমাদের হাতেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ, নতুন কুঁড়ির মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

“নিজেকে কখনো ছোট ভাববে না, নিজেকে যোগ্য ও দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলো। তোমরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই