গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬

মেনু

তোফায়েল ভাইকে নিয়ে কিছু স্মৃতি, কিছু কথা

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:৫৮ পিএম, ০২ জুন ২০২৬ | আপডেট: ২২:৫৮ এএম ২০২৬
তোফায়েল ভাইকে নিয়ে কিছু স্মৃতি, কিছু কথা
ছবি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তোফায়েল আহমেদ

সালেহ উদ্দিন আহমদ
তোফায়েল আহমেদ, আমাদের তোফায়েল ভাই চলে গেলেন। যারা তাকে শুধু হাল-আমলের চশমা দিয়ে চেনেন, তার সম্বন্ধে তারা খুবই কম জানেন। যারা তাকে ১৯৬৯ সালের আন্দোলন থেকে চেনেন, তারা তাকে জানেন একজন সংগ্রামী সংগঠক ও স্বাধীনতা যুদ্ধের এক বিশাল কর্মপুরুষ হিসেবে।

চেষ্টা হয়েছিল একাত্তরকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ গড়তে। সেটা সফল হলে তোফায়েল আহমেদকে স্মরণ করা কিংবা তাকে নিয়ে আজকের এই লেখা হয়তো সম্ভব হতো না। যেহেতু সেই উদ্যোগ সফল হয়নি, তাই আমরা তোফায়েল আহমেদকে সম্মান জানাতে পারছি। আমাদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রামে তার অবদানকে এই জাতি কীভাবে ভুলবে?

১৯৬৮-১৯৬৯ বছরগুলো বাংলার ইতিহাসে অন্য বছরগুলোর মতো ছিল না। ঘটা করে তখন পালিত হচ্ছিল আইয়ুব খানের বাংলাকে শোষণের আরো এক দশক, সরকারি নাম ‘ডিকেড অফ রিফর্মস’।

১৯৬৮ সালের ৬ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার একটা প্রেস নোট জারি করে। সেখানে বলা হয়, পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার একটা নীলনকশা তৈরি করা হয়েছে আগরতলায়। ১৮ জানুয়ারি ঘোষণা করা হয়, এ ষড়যন্ত্রের প্রধান আসামি হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯ মে আরো কয়েকজনসহ শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে জেলখানায় নেওয়া হয়। শেখ মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার এক নম্বর আসামি করে বিচার শুরু হয় বিশেষ সামরিক আদালতে। চারদিকে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ এবং এক ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থা। রাজনৈতিক নেতাদের প্রায় সবাই কারারুদ্ধ, যারা বাইরে ছিলেন, তারা আবার পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

১৯৬৯ সালে তোফায়েল আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি ছিলেন। তার নেতৃত্বেই ধীরে ধীর প্রতিবাদ দানা বাঁধতে শুরু করে। তোফায়েল ভাই ডাকসুর নেতৃত্বে গড়ে তুললেন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। মূল লক্ষ্য, সব রাজবন্দিদের কারাগার থেকে বের করে আনা। আগরতলা ষড়যন্ত্রের উদ্যত ছোবল থেকে বাঁচাতে হবে বাংলার সেই সাহসী মানুষগুলোকে, নতুবা এদের সবার ফাঁসি হয়ে যাবে সামরিক আদালতে। এগারো দফার ভিত্তিতে তাই আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হয়। শেখ মুজিবের দেওয়া ছয় দফা দাবিও এগারো দফার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

আমি ছিলাম এই আন্দোলনের একজন একনিষ্ঠ কর্মী। খুব কাছ থেকে দেখেছি তোফায়েল ভাইকে। যখনই প্রয়োজন হয়েছে কাছে ডেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন।

খালেদ মোহাম্মদ আলী তখন ছিলেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৬৯-এর আন্দোলনের একদিন তার চোখে সরাসরি টিয়ার গ্যাসের শেল এসে আঘাত হানে। তোফায়েল ভাই এগিয়ে এলেন, মহসিন হলে নিয়ে খালেদ ভাইকে পরিচর্যা করতে বললেন।

আন্দোলনের প্রথম দিকে আমরা সারাদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে পিকেটিং করতাম, তারপর আন্দোলন শহরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে খুব দ্রুত। বিকেলে আমরা তৎকালীন ইকবাল হলে (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ফিরে আসতাম। সর্বদলীয় পরিষদের নেতারা বসতেন পরবর্তী দিনের কর্মসূচি ঠিক করতে। তখন বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ নিজেদের সমস্যা নিয়েও তোফায়েল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। তোফায়েল ভাই সবার কথা শুনতেন।
সেই অগ্নিঝরা দিনগুলো কোনোদিন ভুলবার নয়। এগারো দফা আন্দোলন তোফায়েল আহমেদের বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর হয়ে থাকবে। তার ছিল প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যদের সঙ্গে দরকষাকষি করার ক্ষমতা। তিনি যে এতগুলো ছাত্র সংগঠনকে কীভাবে একত্র করে এগারো দফার পক্ষে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, তা কাছ থেকে না দেখলে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অনেক কিছুই আমি বুঝতাম না। এই আন্দোলনে আইয়ুবপন্থী এনএসএফও যোগ দিয়েছিল মাহবুবুল হক দোলন ও নাজিম কামরান চৌধুরীর নেতৃত্বে। তাদেরকে বলা হয়েছিল, পরিষদ বিরোধিতা শুধু গভর্নর মোনেম খানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে। অথচ এই আন্দোলনই আইয়ুব খানের গদি তছনছ করে তাকে গদিছাড়া করল। পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হলো এবং শেখ মুজিবসহ অন্য সব আসামিকে মুক্ত করে দিলো।

১৯৬৯ সালে হঠাৎ যেন তোফায়েল আহমেদ নামটা উল্কার মতো আমাদের রাজনীতির মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছিল। এটা অনিবার্য সত্য যে, ১৯৬৯ সালের আইয়ুববিরোধী ছাত্র-আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা। এই পর্ব থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়ে তোফায়েল ভাই রেখেছেন উজ্জ্বল স্বাক্ষর।

আরেকটা স্মৃতি-১৯৭২ সালের কোনো এক সময়। তখন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বাসায় প্রায়ই যেতাম। জয়নুল ভাই বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্পসামগ্রী নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে যেতেন। মসলিন, জামদানি, কাঁথা, চাদর, নাও-সাম্পান, হুঁকো, বাঁশি, পালকি, ঢেঁকি, পিঠা, কলসি, খড়ম-কিছুই বাদ যেত না।

একদিন শিল্পাচার্য বললেন, “আমি একটা লোকশিল্প জাদুঘর গড়তে চাই, যেখানে হরেক রকম গ্রামীণ শিল্পকর্ম সংরক্ষিত হবে।” তিনি আরো বললেন, সরকারি উদ্যোগ ছাড়া এই প্রকল্প সম্ভব নয়। আমি জয়নুল ভাইকে হঠাৎ প্রস্তাব করলাম আমার সঙ্গে গণভবনে যেতে। আমি জানতাম গণভবনে তোফায়েল ভাই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব। শিল্পাচার্য গণভবনে গেলে তোফায়েল ভাই নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করাবার আয়োজন করবেন, এই বিশ্বাস আমার ছিল। জয়নুল ভাইকে খুব উৎসাহিত মনে হলো না। তিনি বললেন, “যা শুনেছি তার ধারেকাছে যাওয়া সম্ভব নয়। তিনি দেশের কত জরুরি কাজে ব্যস্ত। এসব শোনার তার সময় কোথায়?”

একসময় শিল্পাচার্যকে রাজি করালাম। আমরা রিকশা করে গণভবনে গেলাম। তোফায়েল ভাইকে খুঁজে বের করলাম, তাকে বললাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এসেছেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একটু দেখা করতে। তোফায়েল ভাই শিল্পাচার্যকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করালেন। বাংলার দুই সূর্যসন্তান একান্তে আলোচনা করলেন। সেই সাক্ষাতের সূত্র ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আজকের সোনারগাঁওয়ের লোকশিল্প জাদুঘর।

আরেকবারের কথা। ইউনিভার্সিটি থেকে বের হয়ে অন্য সবার মতো আমারও মনে হলো আমার একটা চাকরির দরকার। টিসিবির চাকরি তখন খুব লোভনীয়, বেতন খুব ভালো; যারা উপরি চান তাদের জন্য সোনায় সোহাগা। আমার মনে হলো উপরি ছাড়াই আমার ভালো চলে যাবে। পরীক্ষাদি দিয়ে টিকে গেলাম। বাঁধ সাধল চূড়ান্ত নির্বাচন। টিসিবির একজন কর্তা শুভাকাঙ্ক্ষীর মতো জানালেন, চেয়ারম্যানের কাছে তদবির না করলে চাকরি হবে না।

ভাবলাম, এ আর এমন কী! বাংলাদেশের প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তখন ছিল তোফায়েল ভাইয়ের হাতে। একদিন রওনা দিলোাম গণভবনে। গণভবনের গেটে গিয়ে আর পা আগাল না। কীভাবে বলব তোফায়েল ভাইকে চাকরির তদবিরের জন্য? টিসিবির চাকরি করা আর হলো না। চাল-ডাল-তেল বিতরণের দায়িত্ব থেকে আমি বেঁচে গেলাম।

তোফায়েল ভাইকে বঙ্গবন্ধু খুব ভালো জানতেন। বঙ্গবন্ধু উপাধিটা শেখ মুজিবুর রহমানকে তোফায়েল ভাইই দিয়েছিলেন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে। শেখ মুজিবের দুঃখজনক মৃত্যুর পর, তার সুযোগ ছিল দলীয় গণ্ডি পেরিয়ে ক্ষমতায় ভাগ বসানোর, যেমনটা করেছিলেন আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতা। তিনি তা করেননি।

পরবর্তীকালে যখন আওয়ামী লীগ পুনর্গঠিত হলো, পুনর্গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু তিনি ও তার মতো আরো কয়েকজন শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতা কখনো শেখ হাসিনার আস্থা অর্জন করতে পারলেন না কোনো দিনই। তাদের ওপর হাসিনার খুব ক্ষোভ ছিল, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর কেন তারা দেশে দুর্বার প্রতিবাদ গড়ে তোলেননি। শেখ হাসিনা তো তখনকার দেশের পরিস্থিতি জানতেন না।

আমার মনে হয় তোফায়েল ভাই সবসময় চাইতেন আওয়ামী লীগের ভেতরে সংস্কার আসুক এবং আওয়ামী লীগ হাসিনার এককেন্দ্রিক নেতৃত্ব হতে বের হয়ে আসুক। ওয়ান ইলেভেনের পর এই জন্য তোফায়েল আহমেদকে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। শেখ হাসিনা মোটামুটি তোফায়েল আহমেদকে আওয়ামী লীগ থেকে পরিত্যাগ করে ফেলেছিলেন। তবে তোফায়েল ভাই কখনো আওয়ামী লীগকে পরিত্যাগ করেননি। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ঠিকই বলেছেন-‘হতাশা এলেও আদর্শ ছাড়েননি’ তিনি।

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি জড়িয়ে তিনি বার্ধক্যে আওয়ামী লীগকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। তার জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। তার বাড়িঘর ভেঙে তছনছ করা হয়েছে, তার চোখের সামনে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে কয়জনকে খুন করার মামলা হয়েছে সঠিক তথ্য আমার জানা নেই। আমাদের দুর্ভাগ্য যে লোকটা দেশের স্বাধীনতায় এত অবদান রেখেছেন, মৃত্যুর আগে তিনি সেই দেশটাতে একটু নিশ্চিন্তে কাটাতে পারলেন না। ওপারে গিয়েই এখন তিনি শান্তি খুঁজে নেবেন।
লেখক: শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সানা/আপ্র/২/৬/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

নজরুলের আলোয় গড়ে উঠুক মানবিক বাংলাদেশ
২৫ মে ২০২৬

নজরুলের আলোয় গড়ে উঠুক মানবিক বাংলাদেশ

জাতীয় কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

কাপাসিয়ার রক্তে রঞ্জিত পরিবারের প্রশ্ন- মানুষ কেন আপনজনের খুনি হয়
১৩ মে ২০২৬

কাপাসিয়ার রক্তে রঞ্জিত পরিবারের প্রশ্ন- মানুষ কেন আপনজনের খুনি হয়

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা আমাদের সময়ের এক ভয়াবহ সামাজিক দ...

সুশাসনের স্বপ্নে এক মানবিক বাংলাদেশ
১০ মে ২০২৬

সুশাসনের স্বপ্নে এক মানবিক বাংলাদেশ

অধ্যাপক ড. মোহা. হাছানাত আলী বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এই ভূখণ্ডের জন্মই হয়েছে সংগ্রাম, স্বপ্ন ও আ...

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের কারণ এবং তার প্রভাব
১০ মে ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের কারণ এবং তার প্রভাব

আব্দুর রহমান পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বড় জয় পেয়েছে। ২৯৪ আসনের বিধানসভা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পদত্যাগ করলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান

বর্তমান সরকারের চারমাস পূর্ণ না হতেই হঠাৎ মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ালেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে তিনি তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। দীপেন দেওয়ানের আকস্মিক এই পদত্যাগের পেছনে শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আপনি কি মনে করেন তিনি সত্যিই অসুস্থতার কারণে সরে গেলেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 20 ঘন্টা আগে