নজরুল ইসলাম
বাংলাদেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতি আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাসস্থানে অনেক বেশি সজীব, সংরক্ষিত এবং উদযাপিত হয়- যা দেশের ভেতরে কখনও কখনও আমরা অনুভব করি না। দেশের বাইরে থাকলে নিজের মাটি, ভাষা ও রীতিনীতি যেন একমাত্র নিজের পরিচয়ের চিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তাই প্রবাসীরা পূজা-পার্বণ, বিয়ের রীতি, পিঠা-পায়েস, লোকগীতি ও জাতীয় দিবসগুলো অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে পালন করেন – যা অনেক সময় দেশের ভেতরে আধুনিকতার প্রভাবে হারিয়ে যেতে বসা রীতিগুলোকে টিকিয়ে রাখে।
যুক্তরাজ্য, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বেড়ে ওঠা সন্তানদের কাছে নিজের সংস্কৃতি তুলে ধরতে প্রবাসীরা সব সময় সচেষ্ট। তাই সেখানে বাংলা স্কুল, সাংস্কৃতিক সংগঠন, নাটক, সাহিত্য আসর সবকিছু অনেক বেশি সক্রিয়। সিলেট-মৌলভীবাজার অঞ্চলের মানুষরা বিশেষ করে বাইরে গেলে নিজেদের আঞ্চলিক রীতিনীতি আরও বেশি করে পালন করেন। প্রবাসে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে যারা বছরজুড়ে নানা অনুষ্ঠান করেন – একুশে ফেব্রুয়ারি, বিজয় দিবস, নববর্ষ, শারদীয়া উৎসব বা বাউল সংগীতের আসর – যা দেশের অনেক স্থানে আর তেমন নিয়মিত নেই।
দেশের ভেতরে শহুরে জীবনযাত্রা, ব্যস্ততা, প্রযুক্তির প্রভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে সংস্কৃতির প্রতি অবহেলা বা ভুল ব্যাখ্যার কারণে অনেক প্রাচীন রীতি-আচার ক্রমেই ম্লান হয়ে আসছে। গ্রামবাংলায় এখনো অনেক কিছু টিকে আছে। কিন্তু শহরকেন্দ্রিক জীবনে তা অনেক কম দেখা যায়। এটি কখনোই বলা যায় না যে, বাংলাদেশে সংস্কৃতি নেই; বরং প্রবাসে তা আরো যত্ন করে সংরক্ষিত হয়। একই সঙ্গে দেশের ভেতরেও অনেক সংগঠন ও সচেতন নাগরিক সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য কাজ করছেন। প্রবাসী সাংবাদিক ও সচেতন ব্যক্তিরা এই দুই প্রান্তের সংযোগ স্থাপন করে সংস্কৃতির বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন- এটা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ক্যামডেন মেলার মতো বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমাদের সংস্কৃতি যেমন সবার হৃদয় জয় করে, ঠিক তেমনই একটি ছোট্ট বিষয় আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে। ক্যামডেন মেলায় বাংলাদেশের সংস্কৃতি, পিঠা-পায়েস, গান, পরিচ্ছদ সবকিছু মানুষ হৃদয় দিয়ে গ্রহণ ও উদযাপন করছেন এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।
অন্যদিকে যে বিষয়টি চোখে পড়েছে, তা হলো ময়লা ফেলার জন্য নির্ধারিত জায়গা বা বিনে না পেলে অনেকে বোতল, প্যাকেট ও আবর্জনা যত্রতত্র ফেলে দিচ্ছেন। যা আমার মনে দাগ কেটেছে, আমরা যে দেশে বাস করছি, সেই দেশের পরিবেশ, আইন ও নিয়মকে সম্মান করছি কি? সংস্কৃতি ভালোবাসার সাথে সাথে ভালো নাগরিক হওয়াটাও আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ নয় কি! যুক্তরাজ্য আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, বসবাস, কর্ম ও স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করেছে। তার পরিবেশ পরিষ্কার রাখা হলো এই দেশটির প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা ও সম্মানের চিহ্ন। আমাদের সংস্কৃতি যত সুন্দরই হোক, পরিচ্ছন্নতা ও নিয়ম মেনে চলার অভ্যাসই আমাদের সম্প্রদায়কে সবার কাছে শ্রদ্ধার স্থান দেয়। এখানে যত্রতত্র ময়লা ফেলা আইনত দণ্ডনীয়, এর জন্য জরিমানা পর্যন্ত হতে পারে।
যে দেশে আমরা বাস করি, সেখানকার নিয়মকানুন মেনে চলাই হলো একজন সত্যিকারের সুনাগরিকের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সুনাগরিক সে-ই নয়, যে শুধু নিজের দেশকে ভালোবাসে। সুনাগরিক সে-ই, যে যে মাটিতে বাস করে, সেই মাটির নিয়মকে সম্মান করে, এবং নিজের আচরণ দিয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
লেখক: ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট, ওয়ার্কিং ফর ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস ইউনাইটেড কিংডম
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/১৯.০৭.২০২৬