ভুলে যাওয়া, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা কিংবা মানসিক ক্লান্তির মতো সমস্যাকে একসময় বয়স বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হতো। কিন্তু এখন ২০ বা ৩০-এর কোঠায় থাকা অনেক তরুণও একই ধরনের সমস্যার কথা বলছেন। পর্যাপ্ত ঘুমের পরও মাথা ভার লাগা, গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে না থাকা কিংবা কোনো কাজে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে না পারার মতো সমস্যা তাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যস্ত জীবনযাপন, অতিরিক্ত পর্দা ব্যবহার, কাজের চাপ এবং সবসময় অনলাইনে থাকার অভ্যাস এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে মানসিক ক্লান্তি ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
সারাক্ষণ ব্যস্ত মস্তিষ্ক
স্মার্টফোনের বিজ্ঞপ্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অফিসের বার্তা ও ই-মেইলের কারণে দিনের বড় একটি সময় নানা ধরনের তথ্যের মধ্যে থাকতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় একই সময়ে একাধিক কাজ করার চেষ্টা।
একটি কাজ শেষ না করেই অন্য কাজে চলে যাওয়ার অভ্যাস মস্তিষ্কের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় কোনো কাজে মনোযোগ রাখা কঠিন হয়ে যায়। প্রয়োজনের সময় তথ্য মনে করতে দেরি হওয়া কিংবা মাথার ভেতর সবকিছু এলোমেলো লাগার মতো অনুভূতিও হতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপও মনোযোগ ও স্মৃতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। চাপের সময় শরীরে কর্টিসলসহ বিভিন্ন হরমোনের মাত্রায় পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘস্থায়ী চাপ শেখা, স্মৃতি, মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো মস্তিষ্কের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে।
এ সময় একই বিষয় বারবার পড়েও মনে না থাকা, কাজে মন বসতে না চাওয়া, অল্পতেই বিরক্ত হওয়া কিংবা মানসিকভাবে ক্লান্ত লাগার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ঘুমের ঘাটতিতেও কমে মনোযোগ
মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমের সময় দিনের বিভিন্ন তথ্য প্রক্রিয়াজাত ও স্মৃতি সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়। তাই নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি হলে মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তিতে তার প্রভাব পড়তে পারে।
শুধু ঘুম নয়, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক সক্রিয়তাও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, পুষ্টির ঘাটতি, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইনের ওপর নির্ভরশীলতা সামগ্রিক সুস্থতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নিয়মিত ব্যায়াম হতে পারে সহায়ক
নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম কিংবা অন্য কোনো শারীরিক কার্যক্রম মানসিক চাপ কমাতে এবং সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। খাদ্যতালিকায় ফল, শাকসবজি, প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার রাখা যেতে পারে।
একসঙ্গে অনেক কাজ নয়
একই সময়ে একাধিক কাজ করার পরিবর্তে একটি কাজ শেষ করে পরের কাজে যাওয়ার অভ্যাস করা ভালো। দীর্ঘক্ষণ মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের মধ্যে নিয়মিত বিরতি নেওয়া উচিত।
অফিসের কাজ শেষ হওয়ার পরও নিয়মিত কাজের বার্তা বা ই-মেইলে যুক্ত থাকার অভ্যাস থাকলে সেখানেও সীমা তৈরি করা প্রয়োজন। মেডিটেশন, মননশীলতার চর্চা ও শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম মানসিক চাপ সামলাতে সহায়ক হতে পারে। অবসর সময়ে হাঁটা, শখের কাজ করা কিংবা পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোও মানসিক স্বস্তি দিতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ
মাঝেমধ্যে কিছু ভুলে যাওয়া বা কয়েক দিন মানসিকভাবে ক্লান্ত লাগা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে স্মৃতি ও মনোযোগের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে থাকলে এবং তা কাজ বা ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করলে বিষয়টি উপেক্ষা করা উচিত নয়।
কারণ একই ধরনের সমস্যার পেছনে ঘুমের সমস্যা, পুষ্টির ঘাটতি, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, হরমোনের পরিবর্তন কিংবা অন্য কোনো শারীরিক কারণও থাকতে পারে। তাই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
মস্তিষ্কও শরীরের মতো বিশ্রাম চায়। কাজের ফাঁকে বিরতি, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন মনোযোগ ও মানসিক কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
সূত্র: হেলথ শটস, টাইমস অব ইন্ডিয়া
এসি/আপ্র/০৫/০৯/২০২৬