বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের ঢালজুড়ে দিগন্ত বিস্তৃত মাচা। সেই মাচায় ঝুলছে সারি সারি লাউ। প্রায় দুই কিলোমিটারজুড়ে বাঁধের ঢালে লাউসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করে অব্যবহৃত জমি কাজে লাগানোর পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা তৈরি করেছেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার চরাঞ্চলের কৃষকরা।
ফুলবাড়ী উপজেলার খোঁচাবাড়ি বাজার পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় বাঁধের ঢালে এ ধরনের চাষাবাদ স্থানীয়দের মধ্যে সাড়া ফেলেছে। বাঁধের মাটির ক্ষয়রোধের পাশাপাশি অব্যবহৃত জমিতে বাণিজ্যিকভাবে সবজি চাষকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।
স্থানীয়রা জানান, ২০১৭ সালের বন্যায় বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধটি ভেঙে যায়। পরে ২০২৫ সালে ভাঙা অংশ মেরামতসহ বাঁধটি সংস্কার করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এরপর থেকেই বাঁধের ঢালে লাউসহ বিভিন্ন সবজি চাষ শুরু করেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁধের ঢালের কোথাও লাউয়ের মাচা, কোথাও কলাগাছ, বাঁশ কিংবা বিভিন্ন সবজির আবাদ। এতে একদিকে বৃষ্টির পানিতে বাঁধের ঢাল ক্ষয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমছে, অন্যদিকে চাষাবাদ করে লাভবান হচ্ছেন চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। কেউ কেউ বাণিজ্যিক ভিত্তিতেও সবজি চাষ করছেন।
হলোখানা ও রাঙামাটি গ্রামের কৃষক আলতাফ হোসেন, জিয়াউল হক জিয়া ও আব্দুল হাকিম যৌথভাবে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় বাঁধের দুই পাশের ঢালে মাচা তৈরি করে লাউ চাষ করেছেন।
কৃষক আলতাফ হোসেন (৫৫) বলেন, গত বছর ছোট পরিসরে বাঁধের ঢালে লাউ চাষ করেছিলেন। বাজারে বিক্রি করে ভালো লাভ হওয়ায় এ বছর বড় পরিসরে চাষ করেছেন। এক মাস আগে গর্তে গোবর দিয়ে উচ্চফলনশীল জাতের লাউয়ের চারা রোপণ করেন। পরে জিআই তার ও বাঁশ দিয়ে দীর্ঘ মাচা তৈরি করেন। নিয়মিত সেচ ও পরিচর্যা করছেন তিনি।
আলতাফ হোসেন জানান, এ বছর তার মোট খরচ হয়েছে ৭৫ হাজার টাকা। এরই মধ্যে ৩১ হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছেন। ফলন ভালো হলে প্রায় দুই লাখ টাকার লাউ বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন।
কৃষক খলিলুর রহমান বলেন, চরাঞ্চলে এমনিতেই তাপপ্রবাহ বেশি। এর ওপর এবার অনাবৃষ্টির কারণে সেচ দিতে হচ্ছে বেশি। পাশের বিল থেকে নিয়মিত সেচ দেওয়ায় খরার প্রভাব থেকে চারাগুলো রক্ষা পেয়েছে। গর্তে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক সার প্রয়োগের পাশাপাশি নিয়মিত পরিচর্যা করা হচ্ছে।
খোঁচাবাড়ি এলাকার কৃষক ফুয়াদ হোসেন বলেন, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও বড়বাড়ি এলাকার পাইকাররা পিকআপে করে লাউ কিনে নিয়ে যান। এরই মধ্যে প্রায় এক হাজার লাউ বিক্রি করেছেন তিনি। প্রতিটির দাম পেয়েছেন ২০ থেকে ৩০ টাকা।
হলোখানা গ্রামের আকবর আলী ও সিরাজুল ইসলাম জানান, লাউয়ের পাশাপাশি কলা, বাঁশ, করলাসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করেছেন তারা। আবাদ ভালো হলে সংসারের আয় বাড়বে বলে আশা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাঁধের ঢালে ব্যাপক সবজি চাষ চরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। এর মাধ্যমে ভূমিহীনরাও চাষাবাদের সুযোগ পেয়েছেন। পাশাপাশি বাজারে তুলনামূলক কম দামে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজি কেনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সারডোব গ্রামের বাসিন্দা এনামুল হক বলেন, গত বছর থেকেই বাঁধের ঢালে সবজি চাষ হচ্ছে। এ বছর কয়েকজন কৃষক বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লাউসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করেছেন। তাদের সাফল্য দেখে আরও অনেকে এ ধরনের চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। এতে উদ্যোক্তারা লাভবান হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় সবজির চাহিদা পূরণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মুন্না হক বলেন, বাঁধের সুরক্ষার জন্য এ ধরনের চাষাবাদ বেশ উপকারী। তাই চাষে বাধা দেওয়া হয়নি। এর মাধ্যমে বাড়তি উৎপাদন করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বাঁধ ও সড়কের ঢালে সবজি চাষে ইদানীং অনেক কৃষক আগ্রহী হচ্ছেন। বিশেষ করে ভূমিহীন কৃষকরা বাঁধের ঢালে চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। কৃষি বিভাগ এ ব্যাপারে কৃষকদের উৎসাহিত করে যাচ্ছে।
এসি/আপ্র/০৫/০৯/২০২৬