বিয়ে, সন্তানের সাফল্য, বহুদিনের প্রতীক্ষিত সুখবর, লটারিতে জয় কিংবা প্রিয় দলের বিশ্বকাপ জয়ের উচ্ছ্বাস—এসব মুহূর্ত জীবনের সবচেয়ে আনন্দের। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, অতিরিক্ত আনন্দও কখনো কখনো হৃদযন্ত্রের ওপর বিপজ্জনক প্রভাব ফেলতে পারে। এ বিরল অবস্থার নাম হ্যাপি হার্ট সিন্ড্রোম, যার চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক নাম টাকোৎসুবো কার্ডিওমায়োপ্যাথি।
একই ধরনের আরেকটি অবস্থা হলো ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোম, যা গভীর শোক বা মানসিক আঘাতের কারণে দেখা দেয়। এছাড়া দীর্ঘ কর্মব্যস্ততার পর ছুটিতে গিয়ে অতিরিক্ত পার্টি, রাত জাগা বা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে হলিডে হার্ট সিন্ড্রোম-এর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
হ্যাপি হার্ট সিন্ড্রোমে অতিরিক্ত ইতিবাচক আবেগের কারণে শরীরে অ্যাড্রেনালিনসহ স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়। এর ফলে হৃদযন্ত্রের বাম নিলয় সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রক্ত পাম্প করার সক্ষমতা কমে যায়। উপসর্গগুলো অনেকটা হার্ট অ্যাটাকের মতো—হঠাৎ বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় করা কিংবা তীব্র দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। তবে সাধারণ হার্ট অ্যাটাকের মতো এ ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্রের ধমনি ব্লক হয় না।
ব্রোকেন হার্ট ও হ্যাপি হার্ট সিন্ড্রোমের শারীরিক প্রভাব প্রায় একই হলেও পার্থক্য রয়েছে কারণে। ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোম সাধারণত প্রিয়জন হারানো, সম্পর্ক ভাঙা বা বড় ধরনের মানসিক আঘাতের পর দেখা দেয়। অন্যদিকে হ্যাপি হার্ট সিন্ড্রোমের কারণ হয় বিয়ে, নাতি-নাতনির জন্ম, বড় পুরস্কার পাওয়া কিংবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো অর্জনের মতো অতিরিক্ত আনন্দের মুহূর্ত।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিনের কাজের চাপের পর ছুটিতে গিয়ে অতিরিক্ত পার্টি, রাত জাগা, অ্যালকোহল গ্রহণ ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের ফলেও হৃদস্পন্দনের অনিয়ম দেখা দিতে পারে, যা হলিডে হার্ট সিন্ড্রোম নামে পরিচিত।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ৬৫ বছর বয়সী এক নারী মেয়ের বিয়ের আনন্দ-উদযাপনের কয়েকদিন পর হঠাৎ বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও হৃদস্পন্দনের অনিয়ম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রথমে হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহ করা হলেও পরীক্ষায় ধমনি স্বাভাবিক পাওয়া যায়। পরে ইকোকার্ডিওগ্রামে তার হৃদযন্ত্রের বাম নিলয় অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে এবং চিকিৎসকেরা তাকে হ্যাপি হার্ট সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করেন। যথাযথ চিকিৎসায় তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। ঘটনাটি *অক্সফোর্ড মেডিক্যাল কেস রিপোর্টস*-এ প্রকাশিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে প্রায় ১ থেকে ৩ শতাংশের ক্ষেত্রে পরে টাকোৎসুবো কার্ডিওমায়োপ্যাথি শনাক্ত হয়। মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের মধ্যে এ রোগ তুলনামূলক বেশি দেখা গেলেও পুরুষ ও কম বয়সীরাও আক্রান্ত হতে পারেন।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, হঠাৎ বুকে ব্যথা, শ্বাস নিতে কষ্ট, বুক ধড়ফড়, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে তা অবহেলা না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। কারণ উপসর্গগুলো হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে মিল থাকায় দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা পেলে অধিকাংশ রোগীই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আনন্দ জীবনের জন্য অপরিহার্য হলেও সুখ বা দুঃখ—যেকোনো চরম আবেগই শরীরে বড় ধরনের হরমোনগত পরিবর্তন ঘটাতে পারে। তাই যাদের হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের অতিরিক্ত উত্তেজনা, রাত জাগা ও অনিয়ন্ত্রিত উদযাপন এড়িয়ে চলা উচিত। সুস্থ হৃদয়ের জন্য আনন্দের পাশাপাশি সংযমও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: হার্ভার্ড হেলথ, এনডিটিভি, আমেরিকান লাইব্রেরি অব মেডিসিন
এসি/আপ্র/২১/০৭/২০২৬