সংস্কারের পর নতুন করে চালু হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি স্থান পাওয়ার পর তা নিয়ে বিতর্ক ও প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার। পরে বিকেলে একই স্থানে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমকে জুতাপেটার ছবি সাঁটিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে ছাত্র ফেডারেশন।
সংগ্রহশালার বর্তমান বিন্যাস নিয়ে মূল প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস উপস্থাপনের ধরন নিয়ে। সেখানে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সময়ের ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ৭ মার্চের ভাষণের মতো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কোনো ছবি নেই। এমনকি বঙ্গবন্ধুর একক বা গৌরবোজ্জ্বল কোনো ছবিও নেই।
অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহর তিনটি ছবি রাখা হয়েছে। একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে তাঁর দেওয়া বক্তব্যের ছবি। ওই অনুষ্ঠানে তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। দ্বিতীয়টি ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি দলীয় ছবি, যেখানে পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিসংবলিত প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল। তৃতীয়টি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কাটিং, যাতে জিন্নাহর ছবি রয়েছে।
তবে সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধুর কোনো উপাদানই নেই-এমন নয়। ১৯৭৪ সালে তাঁর দুই ছেলের বিয়ের একটি ছবি এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত তিনটি সংবাদপত্রের কাটিং রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের একটি খোদাইচিত্রেও তাঁর উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর আলাদা কোনো ছবি রাখা হয়নি।
রোববার সংস্কার শেষে সংগ্রহশালাটি উদ্বোধন করেন ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা। এ সময় ডাকসুর সহসভাপতি সাদিক কায়েম, সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সংগ্রহশালাটি ঘুরে দেখা যায়, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান, পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন এবং ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদীর ওপর হামলা, তাঁর মৃত্যু, সিঙ্গাপুর থেকে মরদেহ দেশে আনা, জানাজা ও দাফন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের ঘটনা ও ব্যক্তির ছবি স্থান পেয়েছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের ছবি, আন্দোলনের বিভিন্ন দৃশ্য, ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক পিয়ারু সরদারের ছবি এবং মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতার উল্লেখ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের কমান্ডার, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কয়েকজন এবং সাত বীরশ্রেষ্ঠের ছবিও রাখা হয়েছে।
১৯৭১ থেকে ১৯৮১ সালের অংশে বঙ্গবন্ধুর দুই ছেলের বিয়ের ছবি ও তাঁর ছবি সংবলিত তিনটি সংবাদপত্রের কাটিং রয়েছে। একই অংশে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের দুটি ছবি, জিয়াউর রহমানের সময়ের খাল খননের দৃশ্য, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার একটি ছবি, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের জিয়াউর রহমানের দুটি ছবি এবং ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যালট পেপারের ছবিও রয়েছে।
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ১৪টি স্থিরচিত্রও রাখা হয়েছে। এর মধ্যে শহীদ নূর হোসেনের বহুল পরিচিত ছবিটি রয়েছে। রয়েছে ডাকসুর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন দৃশ্য, ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত শহীদদের তালিকা এবং শহীদ আসাদকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার ছবিসহ অন্যান্য উপকরণ।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের অংশে রয়েছে ২০১৩ সালের হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগ আন্দোলন, বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ ও সানি হত্যাকাণ্ড, ২০২০ সালের মোদীবিরোধী আন্দোলন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন ছবি। তবে ১৯৯১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়ের বিশেষ কোনো স্থিরচিত্র সেখানে পাওয়া যায়নি।
সংগ্রহশালায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ূন আহমেদ, জসীমউদ্দীন, এ কে ফজলুল হক, মুনীর চৌধুরী, আবুল ফজল, নবাব সলিমুল্লাহ, এম এ জি ওসমানী, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও বরেণ্য সাহিত্যিকের ছবিও রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ছবিও রয়েছে।
‘ইচ্ছা হয়নি, তাই রাখিনি’: বঙ্গবন্ধুর ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কোনো ছবি কেন রাখা হয়নি-জানতে চাইলে ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ‘ফ্যাসিবাদের সব আইকনের’ ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের অংশে বঙ্গবন্ধুর ছবি রয়েছে বলেও তিনি জানান।
তবে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর ছবি না থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইচ্ছা হয়নি, তাই রাখিনি।’
জিন্নাহর ছবি কেন রাখা হয়েছে জানতে চাইলে তাঁর বক্তব্য, তিনি জিন্নাহর ছবি রাখেননি, বরং সংশ্লিষ্ট সময়ের একটি অনুষ্ঠানের ছবি রেখেছেন।
তবে ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনের আগে সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধুর বেশ কয়েকটি ছবি ছিল বলে জানা গেছে। ওই নির্বাচনের আগের দিন প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধুর একাধিক ছবি সংবলিত চিত্রও প্রকাশিত হয়েছিল। ডাকসুর এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, ২০২৫ সালের নির্বাচনে ছাত্রশিবির জয়ী হওয়ার পর ছবিগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। তবে এ বিষয়ে ছাত্রশিবিরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবাদে ছিঁড়ে ফেলা হলো জিন্নাহর ছবি: সোমবার দুপুরে সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার। তিনি ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি পদে স্বতন্ত্র প্রার্থীও ছিলেন। তাঁর বক্তব্য, ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে জিন্নাহর ছবি রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।
এর কিছুক্ষণ পর ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর ছবির স্থানে গোলাম আযমকে জুতাপেটার একটি ছবি সাঁটান।
অর্ক বড়ুয়া বলেন, ‘ডাকসু কারো বাপের না। ইতিহাসকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন কেউ মেনে নেবে না।’ তাঁর বক্তব্য, ১৯৮১ সালে গোলাম আযমকে জুতাপেটার ঘটনাও বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ এবং সেই ইতিহাস সংগ্রহশালায় সংরক্ষণ করা হয়েছে।
১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি বায়তুল মোকাররম মসজিদে একটি জানাজায় গিয়ে গোলাম আযম জুতাপেটার শিকার হয়েছিলেন। একাত্তরে তাঁর ভূমিকার কারণে ঘটনাটি স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের একটি বহুল আলোচিত প্রতীক হয়ে আছে।
গোলাম আযম একাত্তরে শান্তি কমিটি, রাজাকার ও আলবদর বাহিনী গঠনে নেতৃত্ব দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেন। সাজা ভোগের মধ্যে ২০১৪ সালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
অর্ক বড়ুয়া বলেন, জিন্নাহর ছবি রাখার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের যে যুক্তি, একইভাবে তাঁদেরও গোলাম আযমকে জুতাপেটার ছবিকে ইতিহাসের অংশ হিসেবে রাখার অধিকার রয়েছে। এ সময় উপস্থিত শিক্ষার্থীরা হাততালি দেন।
ইতিহাস নির্বাচনের নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন: সংগ্রহশালায় কোন ঐতিহাসিক উপাদান রাখা হবে, তা নির্ধারণের লিখিত নীতিমালা রয়েছে কি না-সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। বঙ্গবন্ধুর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়ের ছবি না থাকা এবং একই সময়ে জিন্নাহর তিনটি ছবি যুক্ত হওয়া নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যেও ভিন্নতা রয়েছে।
সবশেষ ডাকসু নির্বাচনে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক পদে প্রার্থী হওয়া নূমান আহমাদ চৌধুরী অভিযোগ করেন, সংগ্রহশালা সংস্কারে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের ভূমিকা ছিল। তাঁর দাবি, বঙ্গবন্ধুর ছবি সরিয়ে জিন্নাহর ছবি যুক্ত করা হয়েছে। তবে ছাত্রশিবিরের বক্তব্য এ প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
ডাকসুর সাবেক এক নেতারও দাবি, আগে সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি ছিল না। তবে এই দাবির স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সংগ্রহশালার সাবেক কর্মী গোপালচন্দ্র দাসও দাবি করেছেন, তিনি ১৯৯১ সাল থেকে ডাকসুতে কাজ করেছেন এবং সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠার সময় থেকে দুর্লভ ছবি সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর দায়িত্বকালে সেখানে জিন্নাহর কোনো ছবি ছিল না বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, আগে সংগ্রহশালায় অনেক দুর্লভ ছবি ছিল, যেগুলোর কিছু এখন নেই।
ডাকসু বোর্ডেও বিতর্ক: সংগ্রহশালার ডাকসু বোর্ডে ২০১৯ সালের নির্বাচনে সহসভাপতি নির্বাচিত নুরুল হক নুরের নাম থাকলেও সাধারণ সম্পাদকের ঘরটি খালি রাখা হয়েছে। ওই নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। পরে তাঁর ছাত্রত্ব না থাকার অভিযোগে তাঁর পদ বাতিল করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রাশেদ খানকে ওই মেয়াদের সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করে।
বর্তমান ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, গোলাম রাব্বানী ও রাশেদ খান-দুজনের বিষয়েই বিতর্ক রয়েছে। এ কারণে তাঁদের কাউকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ না করে ঘরটি খালি রাখা হয়েছে।
ফলে সংগ্রহশালার নতুন বিন্যাস নিয়ে বিতর্কটি শুধু কোনো একটি ছবি রাখা বা না রাখার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক স্মৃতি কীভাবে সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করা হবে, সেই মৌলিক প্রশ্নও সামনে এসেছে। ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা ঘটনার মূল্যায়ন যাই হোক, সংগ্রহশালার মতো প্রতিষ্ঠানে উপাদান নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, লিখিত ও গ্রহণযোগ্য নীতিমালা থাকা এবং ভিন্নমতের ইতিহাসকেও প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যাসহ উপস্থাপন করা জরুরি।
সানা/আপ্র/১৪/৯/২০২৬