প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ‘প্রতারণার বাজেট’ আখ্যা দিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলেছে, এ বাজেটে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। জনকল্যাণমুখী বা অর্থনৈতিক রূপান্তরমুখী হওয়ার পরিবর্তে এটি ইশতেহারনির্ভর ও অবাস্তব প্রতিশ্রুতিনির্ভর বাজেটে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, এ বাজেটের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত কোনো সংস্কার সম্ভব হবে না।
শুক্রবার (১২ জুন) বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, ‘‘এটা একটা প্রতারণার বাজেট। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এতে ঘটেনি। আমরা চরমভাবে হতাশ এবং উদ্বেগ প্রকাশ করছি।’’
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতি দুর্বল ভিত্তি, ঋণনির্ভরতা ও বৈষম্যের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জন্য একটি রূপান্তরমুখী বাজেট প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সরকার সে পথে না গিয়ে ইশতেহারধর্মী ও অবাস্তব লক্ষ্যনির্ভর বাজেট উপস্থাপন করেছে।
বাজেটের আকার ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট মূলত একটি ‘কাল্পনিক’ বাজেট। গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বড় এ বাজেটের আয় লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে যে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, তা অর্জন করা সম্ভব হবে না বলেও তিনি দাবি করেন।
তার ভাষ্য, সরকার প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের কথা বলছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর রাজস্ব আহরণের চিত্র বিবেচনায় সর্বোচ্চ ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা আদায় হতে পারে। ফলে আড়াই লাখ কোটি টাকারও বেশি ঘাটতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যাংকঋণনির্ভর অর্থায়নের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত ইতোমধ্যে চাপের মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় আরো ঋণনির্ভর বাজেট বাস্তবায়ন করতে গেলে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমনকি শেষ পর্যন্ত টাকা ছাপানোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি আরো বাড়িয়ে দেবে।
তিনি অভিযোগ করেন, বাজেটে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। একই সঙ্গে করব্যবস্থার বিভিন্ন প্রস্তাব সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।
করমুক্ত আয়সীমা প্রসঙ্গে ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় করমুক্ত আয়সীমা আরো বাড়ানো উচিত ছিল। কিন্তু সরকার সামান্য বৃদ্ধি করেছে, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য হতাশাজনক।
এদিকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি সরকারের ঘোষিত নতুন বাজেটের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে কোনো মৌলিক সংস্কার হবে না।
তিনি বলেন, বাজেটে প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাস্তবতাবিবর্জিত। বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো এত রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়নি। বর্তমান কর ও রাজস্ব কাঠামোর মধ্যে থেকে এ বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী’ উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, তারা আশা করেছিলেন বাজেটের মাধ্যমে অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার আসবে। কিন্তু উপস্থাপিত বাজেটের কাঠামোতে সেই সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
তবে বাজেটের কিছু ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, কিছু পণ্যের ওপর কর কমানো হয়েছে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এসব উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এত অল্প সময়ের ব্যবধানে আগে কখনো এভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণের দাবিতে তাদের জোট দেশের বিভিন্ন বিভাগে কর্মসূচি পালন করছে বলেও জানান তিনি।
বাজেটে সুশাসনের অভাব এবং দুর্নীতির ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- এই বাজেট কীভাবে দুর্নীতি বন্ধ করবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। বড় বাজেটের সঙ্গে বড় ধরনের দুর্নীতির সুযোগও তৈরি হয়। বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি ও উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ বণ্টনের ক্ষেত্রে জবাবদিহির ঘাটতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বাজেটে দুর্নীতি ও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপের কথা বলা হয়নি।
তার মতে, জবাবদিহি, সুশাসন ও অর্থনৈতিক সংস্কারের সুস্পষ্ট রূপরেখা ছাড়া এ বাজেট জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবে না।
সানা/আপ্র/১২/৬/২০২৬