মানুষ প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে যে কাজটি সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে করে, তা হলো দাঁত ব্রাশ। পরিচ্ছন্নতা, সুস্বাস্থ্য ও রোগ প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠা সেই টুথপেস্টেই যদি লুকিয়ে থাকে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক, তবে সেটি কেবল একটি পণ্যের ত্রুটি নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে নীরব কিন্তু ভয়াবহ হুমকি। বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪টি ব্র্যান্ডের টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার গবেষণালব্ধ তথ্য আমাদের সামনে এমন এক বাস্তবতা উন্মোচন করেছে, যা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এই তথ্য শুধু উদ্বেগ নয়, রাষ্ট্রীয় সতর্কবার্তার সমান গুরুত্ব বহন করে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিশুদের জন্য তৈরি টুথপেস্টের উল্লেখযোগ্য অংশেও এই ক্ষতিকর কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। শিশুরা দাঁত ব্রাশ করার সময় অনেক ক্ষেত্রেই টুথপেস্ট গিলে ফেলে। ফলে তাদের শরীরে এসব অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক প্রবেশের আশঙ্কা আরো বেশি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য যখন ঝুঁকির মুখে, তখন বিষয়টিকে একটি সাধারণ ভোক্তা অভিযোগ হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্য, নিরাপদ উৎপাদনব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গবেষণার তথ্য নয়; বরং সেই তথ্য আমাদের কী প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। বাজারে বিক্রির আগে এসব পণ্যের মান যাচাই কোথায় ছিল? সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নিয়মিত নজরদারি কতটা কার্যকর? উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এমন উপাদান ব্যবহারের সুযোগ কীভাবে সৃষ্টি হলো? যদি একটি স্বীকৃত গবেষণাগার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এমন ফলাফল প্রকাশ করতে পারে, তবে রাষ্ট্রীয় পরীক্ষাগারগুলো এতদিন কী করছিল? এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য উত্তর জনগণ পাওয়ার অধিকার রাখে।
কেবল টুথপেস্ট নয়, দেশে খাদ্য, প্রসাধনী ও নিত্যব্যবহারের নানা পণ্যের মান নিয়ে অতীতেও একাধিকবার উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাময়িক আলোচনা শেষে বিষয়গুলো বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায়। এই দায়সারা সংস্কৃতি ভাঙতেই হবে। কারণ মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো আপস হতে পারে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল আইন প্রণয়ন নয়; সেই আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ, উৎপাদনব্যবস্থার কঠোর তদারকি, বাজার থেকে ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য অপসারণ এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। গবেষণার ফলাফল নিয়ে দ্বিমত থাকলে তারা বৈজ্ঞানিকভাবে তার জবাব দেবে। কিন্তু অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে কোনো ধরনের অজুহাত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মানুষের আস্থা, জনস্বাস্থ্য এবং নৈতিক ব্যবসায়িক দায়বদ্ধতা-এই তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে উৎপাদনপ্রক্রিয়া সংশোধন, ক্ষতিকর উপাদান সম্পূর্ণ অপসারণ এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার করতে হবে। মুনাফার জন্য মানুষের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়ার অধিকার কোনো প্রতিষ্ঠানের নেই।
এখন সময় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের। সংশ্লিষ্ট সব টুথপেস্টের নমুনা সরকারি উদ্যোগে পুনঃপরীক্ষা করতে হবে। ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে বাজার থেকে প্রত্যাহার, দায়ী প্রতিষ্ঠানকে কঠোর শাস্তি, উৎপাদন ও আমদানির মানদণ্ড আরো কঠোর করা এবং নিয়মিত পরীক্ষার বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে ভোক্তাদেরও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নিরাপদ পণ্য সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য জানাতে হবে।
জনগণ প্রতিদিন যে টুথপেস্ট ব্যবহার করে, সেটি কখনোই বিষের বাহক হতে পারে না। নিরাপদ ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। তাই আর বিলম্ব নয়-টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের এই উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক নজরদারির মাধ্যমে মোকাবিলা করতেই হবে। কারণ একটি সুস্থ জাতি গড়ে ওঠে নিরাপদ খাদ্য, নিরাপদ ওষুধ এবং নিরাপদ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর; অবহেলার ওপর নয়।
সানা/আপ্র/২৮/৭/২০২৬