এক নারীর সঙ্গে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের পরও তার সংসদ সদস্যপদ থাকবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনগত অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বুধবার (২২ জুলাই) বিকেলে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দলটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সাংগঠনিক তদন্তে তার ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানায় জামায়াত।
গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য ছিলেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নিয়ে তাকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর প্রথম দিকে জামায়াতের কয়েকজন নেতাকর্মী এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি বলে দাবি করেছিলেন। পরে মঙ্গলবার গাজী নজরুল ইসলাম নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ভিডিওতে থাকা নারীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন।
তিনি দাবি করেন, গত ১৩ জুলাই রাজধানীর মগবাজারে ওই নারীর বাবার ব্যবসায়িক কার্যালয়ে অবস্থানের সময় কয়েকজন ব্যক্তি তাদের জিম্মি করে টাকা আদায় করে এবং পরে এ ঘটনা নিয়ে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।
তার অভিযোগ, গাড়িচালক ও ওই নারীর মামার সঙ্গে যোগসাজশ করে কয়েকজন ব্যক্তি তাকে হয়রানি করেছে এবং কয়েক দফায় টাকা দাবি করেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মামলা: এদিকে গাজী নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্লবী থানায় মামলা হয়েছে। গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান বাদী হয়ে এ মামলা করেন।
মামলায় অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ, মারধর এবং শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার পর আমিনুর রহমান নামে এক আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বুধবার তাকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম ছাড়াও মাসুম বিল্লাহ, মোতাসসিম বিল্লাহ ও রাকিবুল হাসানকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে বাদীর ভাগ্নির সম্পর্ক নিয়ে বিরোধের জেরে হামলার ঘটনা ঘটে। তবে অভিযোগের সত্যতা তদন্ত শেষে নিশ্চিত হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এমপি পদ থাকবে কি না, বিতর্ক: জামায়াত থেকে বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির বলেছেন, তার মতে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্যপদ থাকবে না। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তের পর বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে জানানো হবে।
তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোস্তফা শাকের উল্লাহ বলেন, শুধু দল থেকে বহিষ্কার হওয়া বা নৈতিক বিতর্কের কারণে কোনো সংসদ সদস্যের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার বিধান নেই।
তিনি বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সদস্য নিজে দল থেকে পদত্যাগ করলে বা দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংসদে ভোট দিলে সদস্যপদ শূন্য হতে পারে। তবে দলীয় বহিষ্কারের ক্ষেত্রে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয়।
তিনি আরো বলেন, কোনো ফৌজদারি মামলায় আদালতের রায়ের মাধ্যমে সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্যতা তৈরি হলে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
জামায়াতের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, দল থেকে বহিষ্কার হলেই গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে না। অপরাধ প্রমাণিত হলে আদালত ও নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সানা/আপ্র/২২/৭/২০২৬