বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় প্রতি ১০ জন প্রাপ্তবয়স্কের প্রায় একজন উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি উদ্বেগ বা বিষণ্নতার উপসর্গে ভুগছেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাককানইবি) এক শিক্ষকের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘হেলথ সায়েন্স রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত গবেষণায় মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার যৌথ উপস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত প্রধান ঝুঁকির কারণগুলো শনাক্ত করা হয়েছে।
জাককানইবির পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের প্রভাষক ড. মোহাম্মদ রকি খান চৌধুরীর নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া স্যান ডিয়েগো, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং অস্ট্রেলিয়ার মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা অংশ নেন।
গবেষণায় ২০২১ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ঝিনাইদহ জেলার একটি গ্রামীণ এলাকার ১ হাজার ৬০৩ জন প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এ ক্ষেত্রে বহুধাপীয় র্যান্ডম নমুনা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উপসর্গ শনাক্তে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জিএডি-৭ ও পিএইচকিউ-৯ স্কেল ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি তিন দফায় রক্তচাপ পরিমাপ করে উচ্চ রক্তচাপের অবস্থা নির্ণয় করা হয়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ৮ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ এবং উদ্বেগ বা বিষণ্নতার উপসর্গ ছিল। এর মধ্যে ৫ দশমিক ২ শতাংশের ক্ষেত্রে উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও উচ্চ রক্তচাপ—তিনটিই একসঙ্গে পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ২ দশমিক ২ শতাংশের ক্ষেত্রে বিষণ্নতা ও উচ্চ রক্তচাপ এবং ১ দশমিক ৩ শতাংশের ক্ষেত্রে উদ্বেগ ও উচ্চ রক্তচাপ একসঙ্গে শনাক্ত হয়েছে।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে উদ্বেগ বা বিষণ্নতার উপসর্গ থাকার হার ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। নারীদের ক্ষেত্রে এ হার ১১ দশমিক ১ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের মধ্যে তা ৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন ব্যক্তি, গৃহিণী, স্থূলতায় আক্রান্ত এবং বেশি কোমর-নিতম্ব অনুপাতের ব্যক্তিদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার যৌথ উপস্থিতির প্রবণতা তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্যগত অবস্থার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ, হৃদ্রোগে আক্রান্তদের ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ এবং পরিবারে উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ১৩ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি উদ্বেগ বা বিষণ্নতার উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে।
ঝুঁকির কারণ বিশ্লেষণে গবেষকেরা গ্র্যাডিয়েন্ট বুস্টিং, কে-নিয়ারেস্ট নেবার, লজিস্টিক রিগ্রেশন, র্যান্ডম ফরেস্ট, সাপোর্ট ভেক্টর মেশিন এবং এক্সট্রিম গ্র্যাডিয়েন্ট বুস্টিং—এই ছয়টি মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করেন। এর মধ্যে সাপোর্ট ভেক্টর মেশিন সবচেয়ে কার্যকর ফল দেয়। পরে শ্যাপ বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিভিন্ন ঝুঁকির কারণের গুরুত্ব নির্ধারণ করা হয়।
বিশ্লেষণে হৃদ্রোগকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাসকারী হিসেবে পাওয়া গেছে। এরপর রয়েছে উচ্চ রক্তচাপের পারিবারিক ইতিহাস, ধূমপানের ইতিহাস, দীর্ঘমেয়াদি রোগ, তামাক ব্যবহার, শিক্ষার স্তর, কোমর-নিতম্ব অনুপাত, কর্মসংস্থানের অবস্থা, শরীরের ভরসূচক ও বয়স।
গবেষকদের মতে, হৃদ্রোগ ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা শরীরে প্রদাহ এবং মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। অন্যদিকে উচ্চ রক্তচাপের পারিবারিক ইতিহাস একজন ব্যক্তিকে জিনগতভাবে বেশি ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ধূমপান ও তামাক ব্যবহার রক্তনালির ক্ষতি এবং স্নায়ুতন্ত্রে পরিবর্তন ঘটিয়ে একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
গবেষকেরা বলছেন, গ্রামীণ বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ ও মানসিক স্বাস্থ্যকে পৃথক স্বাস্থ্যসমস্যা হিসেবে না দেখে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, পরিবারে উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস রয়েছে এমন মানুষ এবং ধূমপায়ী ও তামাক ব্যবহারকারীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
পাশাপাশি ধূমপান ছাড়ার কর্মসূচি, পরিবারভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যুক্ত করা এবং ব্যাপক স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকেরা।
তবে গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এটি দেশের একটি নির্দিষ্ট গ্রামীণ এলাকায় পরিচালিত হওয়ায় এর ফলাফল বাংলাদেশের সামগ্রিক গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রযোজ্য নাও হতে পারে। এ ছাড়া গবেষণাটি ক্রস-সেকশনাল হওয়ায় উচ্চ রক্তচাপ ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে সরাসরি কারণ-সম্পর্ক নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
গবেষকেরা আরো জানিয়েছেন, সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণ শনাক্তে ব্যবহৃত মেশিন লার্নিং মডেল কার্যকর হলেও এর পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা মাঝারি পর্যায়ের ছিল। তাই গবেষণার ফলাফলকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতে বৃহত্তর পরিসরে গবেষণার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এসি/আপ্র/০৬/০৯/২০২৬