ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়ার পর কয়েক দিন, এমনকি এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় পর কাউকে জীবিত উদ্ধার করা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। সাম্প্রতিক নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর এমন কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—খাবার ছাড়া মানুষ আসলে কতদিন বেঁচে থাকতে পারে?
২৬ আগস্ট হিমবাহ ধসের পর আকস্মিক বন্যায় নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়। কাদা ও ধ্বংসাবশেষে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কয়েকটি টানেল আটকে যায়। ৪ সেপ্টেম্বর প্রায় নয় দিন পর দুই কর্মীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। পরদিন প্রায় ১০ দিন পর আরো এক চীনা কর্মীকে ২২৫ মিটার দীর্ঘ একটি টানেল থেকে উদ্ধার করা হয়। একই দিনে নুওয়াকোটে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া ৬৪ বছর বয়সী এক নারীও প্রায় ১০ দিন পর জীবিত উদ্ধার হন।
তবে এসব ঘটনার অর্থ এই নয় যে তারা পুরো সময় খাবার ও পানি—দুটিই ছাড়া ছিলেন। বরং বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বাতাস, পানি পাওয়ার সুযোগ, নিরাপদ জায়গা এবং শরীরের কম নড়াচড়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
খাবার বন্ধ হলে শরীরে কী ঘটে?
মানুষ খাবার না পেলেই শরীর সঙ্গে সঙ্গে কাজ করা বন্ধ করে দেয় না। প্রথমে শরীর জমিয়ে রাখা গ্লাইকোজেন থেকে শক্তি নেয়। এরপর শক্তির জন্য চর্বি ভাঙতে শুরু করে এবং কিটোনসহ বিভিন্ন জ্বালানি ব্যবহার করে।
দীর্ঘ সময় খাবার না পেলে শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি জোগাতে পেশি ও অন্যান্য প্রোটিনও ভাঙতে শুরু করে। অর্থাৎ, শরীরের ভেতরে আগে থেকে সঞ্চিত শক্তির মজুত থাকে, যা কিছু সময় খাবারের ঘাটতি সামাল দিতে সাহায্য করে।
তবে এই সময় কতটা দীর্ঘ হবে, তা সবার ক্ষেত্রে এক নয়। ব্যক্তির ওজন, শরীরে জমা চর্বি, বয়স, শারীরিক অবস্থা, শারীরিক পরিশ্রম, তাপমাত্রা এবং পানি পাওয়ার সুযোগ—সবকিছুর ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।
তাহলে কতদিন না খেয়ে থাকা সম্ভব?
এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত পানি পাওয়া গেলে মানুষ কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত খাবার ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে। তবে এটি কোনোভাবেই নিরাপদ বা স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়। দীর্ঘ অনাহারে শরীরে মারাত্মক বিপাকীয় পরিবর্তন, দুর্বলতা, পেশি ক্ষয় ও বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পানি। খাবার ছাড়া তুলনামূলক দীর্ঘ সময় টিকে থাকা সম্ভব হলেও পানি না পেলে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি সংকটজনক হয়ে উঠতে পারে।
৩৮২ দিনের বিরল ঘটনা
খাবার ছাড়া বেঁচে থাকার সবচেয়ে আলোচিত নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর একটি স্কটল্যান্ডের অ্যাঙ্গাস বারবিয়েরির। ১৯৬৫ সালে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তিনি ৩৮২ দিন কঠিন খাবার গ্রহণ না করে ছিলেন।
তার ওজন ছিল প্রায় ২১৪ কেজি, যা পরে কমে প্রায় ৮১ কেজিতে নেমে আসে। এ সময় তিনি পানি, চা, কফি, সোডা ওয়াটার, ভিটামিন ও চিকিৎসকদের নির্ধারিত অন্যান্য পরিপূরক গ্রহণ করেছিলেন।
তাই এই ঘটনাকে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া সাধারণ মানুষের সঙ্গে তুলনা করা ঠিক নয়। এটি ছিল বিশেষ চিকিৎসা-নজরদারির মধ্যে পরিচালিত একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।
ধ্বংসস্তূপে কীভাবে কেউ এতদিন টিকে থাকেন?
ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষ সাধারণত বেশি নড়াচড়া করতে পারেন না। ফলে শরীরের শক্তির চাহিদাও কমে যেতে পারে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে যদি ছোট কোনো ফাঁকা জায়গা থাকে, সেখানে বাতাস চলাচল করে এবং ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত না হন, তাহলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে।
এর সঙ্গে সামান্য হলেও পানি পাওয়ার সুযোগ থাকলে পরিস্থিতি আরো অনুকূল হয়। ফলে কাউকে ১০ দিন পর জীবিত উদ্ধারের ক্ষেত্রে শুধু খাবারের অনুপস্থিতিকে বিবেচনা করলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না।
২০২৩ সালের তুরস্ক-সিরিয়া ভূমিকম্পেও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে দীর্ঘ সময় পর মানুষকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছিল। সেসব ক্ষেত্রেও পানি, বাতাস, শারীরিক অবস্থা এবং ধ্বংসস্তূপের গঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
দীর্ঘ অনাহারের পর হঠাৎ বেশি খাবারও বিপজ্জনক
দীর্ঘ সময় খাবার না পাওয়ার পর হঠাৎ করে প্রচুর খাবার খাওয়ানোও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। দীর্ঘ অনাহারের পর খাবার ফেরানোর সময় **রিফিডিং সিন্ড্রোম** নামের গুরুতর বিপাকীয় জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা কাউকে উদ্ধারের পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে খাবার ও তরল দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং মানুষ ঠিক কতদিন না খেয়ে বাঁচতে পারে—এর একক কোনো উত্তর নেই। পানি ও অক্সিজেনের প্রাপ্যতা, শরীরে সঞ্চিত শক্তি, আবহাওয়া, আঘাত এবং শারীরিক অবস্থাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে একজন মানুষ কতটা সময় টিকে থাকতে পারবেন।
সূত্র: রয়টার্স, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ
এসি/আপ্র/০৬/০৯/২০২৬