যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আদালতের নথিতে ভয়াবহ ও নৃশংস বিবরণের বিস্তারিত উঠে এসেছে। ঘটনার পর একজনকে গ্রেফতার করে তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আদালতের নথি ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, লিমন ও বৃষ্টিকে তাদের অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে একাধিকবার আঘাত করে হত্যা করা হয় বলে তদন্তকারীদের ধারণা। এরপর ঘটনাস্থল পরিষ্কার করে লিমনের মরদেহ বড় কালো আবর্জনার ব্যাগে ভরে ব্রিজের পাশে ফেলে দেওয়া হয়। পরে ওই স্থান থেকেই মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
বৃষ্টির সন্ধানে তল্লাশির সময় হিলসবোরো কাউন্টির একটি জলাশয় থেকে মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সেটি বৃষ্টির কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে লিমনের রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়েহ নামের ২৬ বছর বয়সী এক মার্কিন নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে প্রথম ডিগ্রির পরিকল্পিত হত্যার দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, হত্যার আগে ও পরে আলামত ধ্বংস এবং লাশ গুমের চেষ্টা করা হয়।
আদালতের নথিতে আরো উল্লেখ করা হয়, হত্যার পর বিভিন্ন পরিষ্কার করার সামগ্রী ব্যবহার করে রক্ত ও আলামত মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। পরে লাশ ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র আবর্জনার ব্যাগে ভরে ডাম্পিং স্থানে ফেলে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থল ও গাড়ির অবস্থান বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজনের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হওয়ার দাবি করেছে তদন্ত সংস্থা।
তদন্তে জানা যায়, নিহতদের মোবাইল ফোন ও অভিযুক্তের ফোন একই সময়ে একই এলাকার কাছাকাছি অবস্থানে ছিল। এছাড়া নজরদারি ক্যামেরা, গাড়ির তথ্য এবং ডিজিটাল রেকর্ডেও তার উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযুক্ত অনলাইন মাধ্যমে হত্যার উপকরণ সংগ্রহ এবং লাশ গুমের বিষয়ে তথ্য অনুসন্ধান করেছিলেন বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
লিমনের শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে এবং তার হাত ও পা বাঁধা অবস্থায় ছিল বলে মেডিকেল রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তার মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
লিমন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ছিলেন এবং নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ছিলেন। তারা দুজনই উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন এবং দীর্ঘদিনের বন্ধু ছিলেন। পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে পারিবারিক সম্মতিতে বিয়ের পরিকল্পনাও ছিল।
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শোক প্রকাশ করেছে এবং তদন্তে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। পুলিশ এখনো হত্যার মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য জানায়নি।
মেয়ের স্মৃতি রাখতে জিনিস ফেরত চান বাবা: যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণরত অবস্থায় খুন হওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মরদেহ ও ব্যবহৃত ব্যক্তিগত জিনিসপত্র দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন তার বাবা জহির উদ্দিন আকন।
তিনি বলেন, মেয়ের মরদেহ এখনো উদ্ধার হয়নি। দ্রুত মরদেহ উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি তার ব্যবহৃত জিনিসপত্রও ফেরত দেওয়া হলে সেটিই হবে পরিবারের শেষ স্মৃতি।
সোমবার মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর এলাকায় বৃষ্টির বাড়িতে যান। এ সময় তিনি বৃষ্টির বাবার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন এবং পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
জেলা প্রশাসক বলেন, এ ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। পরিবারটির পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, বৃষ্টির ব্যবহৃত জিনিসপত্র ফেরত আনার বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্বসহকারে দেখছে।
এর আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বৃষ্টির বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন এবং সার্বিক খোঁজখবর নেন।
নিহত নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ওই এলাকার বাসিন্দা। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করছিলেন। তিনি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ছিলেন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ১৬ এপ্রিল বৃষ্টি ও তার এক সহপাঠী নিখোঁজ হন। পরে ওই সহপাঠীর মরদেহ উদ্ধার করা হলেও বৃষ্টির মরদেহ এখনো পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় একজন মার্কিন নাগরিককে গ্রেফতার করেছে স্থানীয় পুলিশ। তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ সময় বৃষ্টির পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সানা/আপ্র/২৮/৪/২০২৬