কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করে মানচিত্র প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের সঙ্গে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ও নৌপথটি সচল রাখা নিয়ে উত্তেজনা যখন তীব্র, তখন মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ মানচিত্র প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা এখন চলছে না এবং নির্ধারিতও নেই বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।
পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর ও আরব সাগরকে সংযুক্তকারী হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। ট্রাম্প এর আগে সোমবার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মার্কিন নৌ অবরোধের মাধ্যমে প্রণালিটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এটিকে মার্কিন ভূখণ্ড ঘোষণা করার ধারণাটি তাঁর পছন্দ। গত শুক্রবার নিউইয়র্কে এক রাজনৈতিক সমাবেশেও তিনি প্রথম এ ধরনের ঘোষণা দেওয়ার কথা বলেছিলেন।
মঙ্গলবার প্রকাশিত মানচিত্রে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ লেখা হয়। এর মধ্য দিয়ে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে প্রণালিটির ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ট্রাম্পের আগের বক্তব্য আরও স্পষ্ট রূপ পেল।
তবে ট্রাম্পের দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান জানিয়েছে ইরান। দেশটির শীর্ষ মধ্যস্থতাকারী ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র জুনের অন্তর্বর্তী সমঝোতায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খোলা হবে না।
গালিবাফের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সমঝোতার শর্তগুলোর মধ্যে ছিল ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের তেল খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা এবং সামরিক হুমকি ও অভিযান বন্ধ করা। এসব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ খোলার প্রশ্ন নেই বলে তিনি স্পষ্ট করেছেন।
জুনে স্বাক্ষরিত ওই অন্তর্বর্তী সমঝোতার মেয়াদ ৬০ দিনের জন্য নির্ধারিত ছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বৃহত্তর সমঝোতা না হওয়ায় সেটি কার্যত ভেঙে পড়ে। দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা সংস্থা জানিয়েছে, প্রণালি দিয়ে বের হওয়ার সময় একটি জাহাজ অজ্ঞাত কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা নিক্ষিপ্ত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি একজন নাবিক হতাহত হয়েছেন। বাকি নাবিকদের সহায়তায় ওমানের কোস্টগার্ড এগিয়ে আসে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি ১৫ আগস্ট ঘটলেও এর তথ্য পরে পাওয়া যায় এবং মঙ্গলবার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এর ফলে হরমুজে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে সতর্কতা জারি হয়েছে।
ট্রাম্প মঙ্গলবার দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি খোলা ও নিরাপদ রয়েছে এবং পানিতে থাকা সব মাইন সরিয়ে নেওয়া বা নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন নৌ অবরোধ বহাল থাকার কথাও জানান তিনি। কিন্তু ইরানের বক্তব্য এবং সাম্প্রতিক জাহাজ চলাচলের তথ্যের সঙ্গে তাঁর দাবির মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে।
জ্বালানি পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালির গুরুত্বও সংকটটিকে বৈশ্বিক উদ্বেগে পরিণত করেছে। বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের একটি বড় অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাজার ও বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেও ওমানের সঙ্গে ইরানের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে তাঁর কোনো আলোচনা চলছে না এবং নতুন কোনো আলোচনাও নির্ধারিত নেই। ফলে হরমুজকে ঘিরে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকার আশঙ্কাই এখন বেশি।
সানা/আপ্র/১৯/৮/২০২৬