রাজস্ব খাতে সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ঋণনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
আমির খসরু বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থাকে আধুনিক, নগদ অর্থনির্ভরতা কমানো এবং করদাতা ও কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার সংস্কার করছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন আর ঋণের ওপর নির্ভরশীল দেশ থাকবে না। এটি এখন নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে ইনশাআল্লাহ।’
রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যের কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি সময়ে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
২০২৯ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের সারিতে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ এবং ২০৩৪ সালে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্য অর্জনে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের সময়মতো কর দেওয়ার আহ্বান: ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি উল্লেখ করে তাদের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ভূমিকার প্রশংসা করেন আমির খসরু। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব লক্ষ্য অর্জনে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা চান তিনি।
তিনি বলেন, ‘এটা কর কর্মকর্তাদের একার দায়িত্ব নয়। এখানে ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্ব আছে। সময়মতো কর ও ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে।’
করদাতাদের প্রশাসনিক জটিলতা ও কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়ে অভিযোগের কথা স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানে সরকার কাজ করছে। তবে যারা রাজস্ব ফাঁকির সংস্কৃতি ধরে রাখতে চান, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
তার ভাষ্য, এতে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হবেন না এবং ব্যবসায় সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।
এনবিআরকে দুই প্রতিষ্ঠানে ভাগের উদ্যোগ: রাজস্ব প্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কারের কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রমকে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার পৃথক কাঠামোয় নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, পুরোনো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর একটি হবে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং অন্যটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ।
রাজস্ব নীতি বিভাগ বিশেষজ্ঞ সংস্থা হিসেবে সুষম, প্রতিযোগিতামূলক ও উন্নয়নবান্ধব কর কাঠামো তৈরিতে কাজ করবে। আর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ রাজস্ব আহরণ, আইনের প্রয়োগ ও কর প্রশাসনের বাস্তবায়নমূলক দায়িত্ব পালন করবে।
আমির খসরু বলেন, এটি শুধু প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস নয়; রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দর্শনে একটি মৌলিক পরিবর্তন।
করনীতি প্রণয়নে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অর্থনীতিবিদ, গবেষক, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, শিল্প ও বাণিজ্য সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
‘কন্ট্যাক্ট-ফ্রি’ রাজস্ব প্রশাসনের লক্ষ্য: রাজস্ব প্রশাসনে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়ে আমির খসরু বলেন, করদাতাকে অপ্রয়োজনে কর কর্মকর্তার কাছে যাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
‘সম্পূর্ণ কন্ট্যাক্ট-ফ্রি, ফেইসলেস রাজস্ব প্রশাসন হল আমাদের লক্ষ্য’, বলেন তিনি।
ই-ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, ই-ভ্যাট সিস্টেম, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো, কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট ও প্রযুক্তিনির্ভর স্ক্যানিংয়ের মতো উদ্যোগের ফলে করদাতারা ঘরে বা অফিসে বসেই বিভিন্ন সেবা নিতে পারছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
করদাতার যেমন আইন মেনে কর দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি রাজস্ব কর্মকর্তাদেরও নিরপেক্ষভাবে আইন মেনে সম্মানের সঙ্গে সেবা দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। একই সঙ্গে রাজস্ব প্রশাসনে জবাবদিহির ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করার তাগিদ দেন তিনি।
বাড়বে করজাল, কমবে কর অব্যাহতি: মাঠপর্যায়ে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে নতুন করদাতা শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন আমির খসরু। নিয়মিত করদাতারা যাতে সহজে ও সঠিকভাবে কর দিতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরির কথাও বলেন তিনি।
কর অব্যাহতি ধীরে ধীরে কমানোর পক্ষে অবস্থান জানিয়ে তিনি বলেন, শিল্পায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে কর অব্যাহতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেশের শিল্প খাত এখন পরিণত ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হচ্ছে। তাই ধীরে ধীরে এই অব্যাহতি কমাতে হবে।
এতে রাজস্ব বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন তিনি।
বিরোধ নিষ্পত্তিতে বিকল্প ব্যবস্থার ওপর জোর: ভ্যাট ও কাস্টমস আইন সংস্কারের প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, করদাতাদের হয়রানি বন্ধ এবং আস্থাভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চলতি বাজেটে বেশ কিছু সংস্কার আনা হয়েছে। রাজস্বসংক্রান্ত বিরোধ বছরের পর বছর ঝুলিয়ে না রেখে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি।
‘সরকারের লক্ষ্য মামলা বাড়ানো নয়, সঠিক রাজস্ব দ্রুত এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে আদায় করা’, বলেন আমির খসরু।
করদাতাদের জন্য একটি স্পষ্ট করদাতা সেবা সনদ চালুর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। কোন সেবা কত দিনের মধ্যে পাওয়া যাবে, কোন কর্মকর্তার কী দায়িত্ব, অভিযোগ কোথায় করা যাবে এবং কত সময়ের মধ্যে তা নিষ্পত্তি হবে-এসব বিষয়ে করদাতাদের স্পষ্ট অধিকার থাকা উচিত বলে মনে করেন মন্ত্রী।
রাজস্ব প্রশাসনের সাফল্য শুধু কত টাকা আদায় হয়েছে, তা দিয়ে নয়; করদাতার সন্তুষ্টি ও সেবার মান দিয়েও মূল্যায়ন করার আহ্বান জানান তিনি।
‘ব্যবসায়ীদের আর্থিক যাত্রার সঙ্গী এনবিআর’: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে শুধু রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে ব্যবসায়ীদের আর্থিক যাত্রার অংশীদার হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, রাজস্ব বোর্ড এখন কেবল রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান নয়; একজন ব্যবসায়ীর আর্থিক যাত্রার সঙ্গী। কর দিয়ে যেন করদাতারা গর্ববোধ করেন এবং সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজেদের সরাসরি অংশীদার মনে করেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অনলাইনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। পরে তিনি বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন।
সানা/আপ্র/১৮/৮/২০২৬