মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অভিযান ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সেনাপ্রধান অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আজিজ আহমেদকে গ্রেফতারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোকে চিঠি দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময় আজিজ আহমেদ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক ছিলেন। পরে ২০১৮ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২১ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
ইন্টারপোলের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশের বিচারিক কর্তৃপক্ষের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা আদালতের আদেশের ভিত্তিতে কোনো পলাতক ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে গ্রেফতারে সদস্য দেশগুলোর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনুরোধ জানাতে রেড নোটিস জারি করা হয়। তবে রেড নোটিস নিজে কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। সংশ্লিষ্ট দেশে কাউকে গ্রেফতার করা হবে কি না, তা ওই দেশের নিজস্ব আইনের ওপর নির্ভর করে।
শাপলা চত্বরের মামলায় আজিজ: ২০১৩ সালের ৫ মে শাহবাগের আন্দোলনের বিপরীতে ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে মতিঝিলে সমাবেশ ডেকেছিল হেফাজতে ইসলাম। ওই সমাবেশ ঘিরে সেদিন মতিঝিল এলাকায় ব্যাপক সহিংসতা ও তাণ্ডবের ঘটনা ঘটে। পরে রাতে যৌথ অভিযান চালিয়ে হেফাজত কর্মীদের সরিয়ে দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ২০ আগস্ট শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী। এরপর নতুন করে তদন্ত শুরু হয়।
হেফাজত নেতাদের অভিযোগ, ওই রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। তবে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি এসেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তে ৫ ও ৬ মে ঢাকা ও আশপাশের চার জেলায় ওই অভিযানকে কেন্দ্র করে ৫৮টি হত্যার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
গত ২৭ জুলাই এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতক ৩১ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। তাঁদের একজন সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ।
দুর্নীতির অভিযোগও তদন্তে: শাপলা চত্বরের মামলা ছাড়াও আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আজিজ আহমেদ এবং তাঁর দুই ভাই হারিস আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ জোসেফের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার ও ক্রয়সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে সম্পদ অর্জন এবং মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে অর্থ ও সম্পদ রাখার অভিযোগের কথা বলা হয়।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আদালতে দেওয়া দুদকের আবেদনে জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে সম্পদ অর্জন এবং ব্যাংক ও হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে তদন্ত চলার কথা উল্লেখ করা হয়। একই আবেদনে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে ব্যবসা ও সম্পত্তি কেনার অভিযোগও ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা: দুর্নীতির অভিযোগে ২০২৪ সালের ২০ মে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আজিজ আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। তাঁকে ‘উল্লেখযোগ্য দুর্নীতিতে’ জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ছিল, আজিজ আহমেদ সরকারি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে তাঁর এক ভাইকে অপরাধের দায় থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করেছেন। সামরিক ক্রয়চুক্তিতে অনিয়ম এবং ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য সরকারি পদে নিয়োগের বিনিময়ে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও তোলে দেশটি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন আজিজ আহমেদ। নিষেধাজ্ঞার পর তিনি বলেছিলেন, তিনি রাজনীতি বা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন এবং তাঁকে কেন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে তিনি বিস্মিত।
আলজাজিরার তথ্যচিত্রে অভিযোগ: আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বড় একটি অংশ জনসম্মুখে আসে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আলজাজিরার অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ প্রকাশের পর।
প্রতিবেদনটিতে আজিজ আহমেদ, তাঁর কয়েকজন ভাই এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়। তাঁর ভাই হারিস আহমেদ ও আনিস আহমেদকে সুরক্ষা দেওয়া এবং বিদেশে সম্পত্তি ও ব্যবসা গড়ে তুলতে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও ছিল সেখানে।
তথ্যচিত্র প্রকাশের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন ও অপপ্রচার বলে অভিহিত করে। আজিজ আহমেদও এসব অভিযোগকে মিথ্যা, সাজানো ও স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছিলেন।
এনআইডি নিয়েও তদন্ত: আজিজ আহমেদের পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়েও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুনে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল জানিয়েছিলেন, আজিজ আহমেদের দুই ভাই হারিস আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ জোসেফ ভিন্ন নামে বা ভুল তথ্য দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়েছেন-এমন অভিযোগ তদন্তে কমিটি করা হয়েছে। তবে ওই তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে পরবর্তী সময়ে আর কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি নির্বাচন কমিশন।
সানা/আপ্র/১৮/৮/২০২৬