বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাঁকে প্রাপ্য মর্যাদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ সম্মান ও স্মরণীয় অভ্যর্থনা জানানো হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত বৈঠক হওয়া প্রয়োজন বলেও মোদি জানিয়েছেন। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর গুলশানে এক অনুষ্ঠানে এসব কথা জানান।
বাংলাদেশ সফররত ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সম্মানে ভারতীয় হাইকমিশন আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন দীনেশ ত্রিবেদী। অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, সংগঠনটির মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জিসহ বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি সরাসরি দিল্লি গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে নরেন্দ্র মোদি তাঁকে বলেছেন, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত সাক্ষাৎ হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশকে তাঁর পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করতে বলেছেন, তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাঁকে এমন অভ্যর্থনা জানানো হবে, যা তাঁর প্রাপ্য এবং সফরটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শেষ পর্যন্ত এই সফরের সুফল দুই দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে বলেও মোদি জানিয়েছেন।
এর আগে ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবার সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন দীনেশ ত্রিবেদী। ওই বৈঠকে তিনি জানান, ভারত সরকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সপরিবারে দিল্লি সফরে স্বাগত জানাতে আগ্রহী। পরদিনই দিল্লি গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে ঢাকার বার্তা পৌঁছে দেন তিনি।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রীই প্রথম তারেক রহমানকে নির্বাচনে বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং তাঁকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এরপর ভারতের লোকসভার স্পিকার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বাংলাদেশ সফর করেছেন। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানানোর ভারতের আগ্রহই প্রকাশ পেয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য ও সমস্যা থাকার কথাও স্বীকার করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। তিনি বলেন, গত কয়েক সপ্তাহে এসব মতপার্থক্য নিয়ে বাংলাদেশের মন্ত্রীদের সঙ্গে ভারত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশের জনগণের উদ্বেগগুলো ভারত গভীরভাবে বোঝে। এসব উদ্বেগ কমাতে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও সাক্ষাৎ প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, পরিবারেও ছোটখাটো ভুল-বোঝাবুঝি হয়; তাই বলে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় না।
দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সত্যিকারের বন্ধু তারাই, যারা একে অপরের সমস্যা বুঝতে পারে। বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত শুধু একটি সীমান্ত ভাগ করে নেওয়া দুই দেশ নয়; দুই দেশের মানুষের মধ্যে অভিন্ন স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও সমতার ধারণাও রয়েছে। অতীতকে সঙ্গে রেখে পুরোনো সমস্যাগুলোর সমাধান করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। স্থবির হয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন।
নতুন বাংলাদেশের তরুণদের প্রসঙ্গ তুলে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, এ দেশের তরুণরা অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে গেছে। দুই দেশের লক্ষ্য শান্তি ও সমৃদ্ধি। তরুণদের সেই সুযোগ তৈরি করতে বাংলাদেশ ও ভারতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দুই দেশের লক্ষ্য অভিন্ন এবং কোনো পক্ষই একে অপরের চেয়ে ছোট বা বড় নয়। অতীতকে ভুলে যাওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং অতীতের মতপার্থক্যগুলো সমাধান করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ঢাকার আহ্বান
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ভারত বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। বছরের পর বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়লেও বাণিজ্য কাঠামো এখনো ভারসাম্যহীন এবং সম্ভাবনার তুলনায় কম।
তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যের তুলনায় বাংলাদেশ দূরের অংশীদারদের সঙ্গে বেশি বাণিজ্য করে। তাই সামগ্রিক অর্থনৈতিক অংশীদারি বাড়ানো, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ দূর করা এবং দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য ভারতের ব্যবসায়িক ভিসা প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করার আহ্বান জানান তিনি। এতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা আরও ঘন ঘন ভারতে গিয়ে ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়াতে পারবেন বলে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী।
চিকিৎসা পর্যটন ইতিমধ্যে দুই দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যেও নিয়মিত ও স্বতঃস্ফূর্ত যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
সিআইআইয়ের মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং দেশের শিল্প খাতের আন্তরিকতা তাঁরা পেয়েছেন। আরও ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরির মাধ্যমে এই আন্তরিকতার মর্যাদা রাখতে তাঁরা কাজ করবেন।
অনুষ্ঠানে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী, এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক, মেট্রো চেম্বারের সভাপতি কামরান টি রহমান, বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী, ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমানসহ দুই দেশের ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সানা/আপ্র/১৯/৮/২০২৬