রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের সূচনা বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ বাঁক। বহু দশকের পরিকল্পনা, কূটনৈতিক উদ্যোগ, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমন্বয়ে এই অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশ কেবল একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে এগোয়নি; বরং প্রবেশ করেছে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার এক নতুন যুগে, যেখানে স্থিতিশীলতা, দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা একসূত্রে গাঁথা।
এই প্রকল্পের শিকড় স্বাধীনতারও আগে, ষাটের দশকের প্রারম্ভিক উদ্যোগে নিহিত। তবে বাস্তব অগ্রযাত্রা গতি পায় সাম্প্রতিক দেড় দশকে। ২০০৯ সালের পর রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে প্রচেষ্টা শুরু হয়, তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক চুক্তি, ২০১৫ সালে নির্মাণ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা এবং ২০১৭ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন-প্রতিটি ধাপ একে একে রূপপুরকে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড় করিয়েছে। বৈশ্বিক মহামারি, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট সত্ত্বেও এই প্রকল্প জ্বালানি লোডিংয়ের পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও অঙ্গীকারের এক সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্বীকার করতে হবে-গত দেড় দশকে দেশের অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। একই সঙ্গে শাসনব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনাও ছিল। পরিণত রাষ্ট্রচিন্তার দাবি হলো-উন্নয়নকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ত্রুটি থেকে শিক্ষা নেওয়া। কারণ উন্নয়ন কোনো একক সরকারের সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রার ফল।
রূপপুর প্রকল্পের প্রযুক্তিগত দিক বিবেচনায় এর গুরুত্ব আরো গভীর। ইউরেনিয়াম জ্বালানির ক্ষুদ্র পেলেট থেকে বিপুল শক্তি উৎপাদনের সক্ষমতা, কার্বন নিঃসরণহীন বিদ্যুৎ এবং দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন ধারাবাহিকতা-এসব বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশকে একটি টেকসই জ্বালানি কাঠামোর দিকে এগিয়ে নিতে পারে। পূর্ণ সক্ষমতায় এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ শিল্প, কৃষি ও নগর অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে-এতে সন্দেহ নেই।
তবে পারমাণবিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিশেষ দায়িত্ব। নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনবল গঠন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কঠোর অনুসরণ-এসব ক্ষেত্রে কোনো আপসের সুযোগ নেই। ফুয়েল লোডিং থেকে শুরু করে নিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়া এবং পূর্ণ উৎপাদন-প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের আস্থা অর্জনে তথ্যপ্রবাহ উন্মুক্ত রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করা অপরিহার্য।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নটি হলো-উন্নয়ন কি রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে থেমে যাবে, নাকি তা রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতার অংশ হয়ে উঠবে? রূপপুর প্রকল্প স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, বৃহৎ ও কৌশলগত উদ্যোগ বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নীতির ধারাবাহিকতা অপরিহার্য। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু জাতীয় উন্নয়ন অঙ্গীকারের গতি থামা উচিত নয়।
অতএব, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর প্রতি প্রত্যাশা-উন্নয়নকে দলীয় সীমারেখার বাইরে নিয়ে গিয়ে জাতীয় স্বার্থের অভিন্ন কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করা। যে প্রকল্প দেশের কল্যাণ বয়ে আনে, তা অব্যাহত রাখা এবং আরো উন্নত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। উন্নয়ন যেন কখনোই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বলি না হয়-এটাই হওয়া উচিত পরিণত গণতন্ত্রের পরিচয়।
রূপপুর আজ একদিকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রতীক, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতার অগ্নিপরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে টেকসই, আধুনিক ও আত্মনির্ভর উন্নয়নের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে পারবে।
সানা/আপ্র/৩০/৪/২০২৬