গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

মেনু

অবহেলার অগ্নিপরীক্ষায় শিশুস্বাস্থ্য

হাম প্রাদুর্ভাবে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির নির্মম বাস্তবতা

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৩:১৯ পিএম, ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ১৫:৩৬ এএম ২০২৬
হাম প্রাদুর্ভাবে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির নির্মম বাস্তবতা
ছবি

ছবি সংগৃহীত

দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ বিস্তার এখন আর কেবল একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, নীতিনির্ধারণ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার কার্যকারিতার কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। গত দেড় মাসে হাম ও হাম-সন্দেহে ২৫১ শিশুর মৃত্যু-যার মধ্যে ৪২ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত-একটি গভীর উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। আরো উদ্বেগজনক হলো, প্রতিদিনই নতুন করে মৃত্যুর সংখ্যা যুক্ত হচ্ছে এবং আক্রান্তের ঢেউ ক্রমাগত উঁচুতে উঠছে।

পরিসংখ্যান বলছে, একই সময়ে ৪ হাজার ৪৬০ শিশু নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং ৩০ হাজারের বেশি শিশু উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে। এই বিপুল সংখ্যক সংক্রমণ ও মৃত্যুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ। বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের প্রায় সব জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে, যা একটি নিয়ন্ত্রণহীন জনস্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

এই পরিস্থিতির পেছনে যে কারণগুলো ক্রিয়াশীল, তা বহুদিন ধরেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছিলেন। টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন, অপুষ্টি, এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা-সব মিলিয়ে এই প্রাদুর্ভাবের জন্য এক ধরনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন বা পৃথক রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় আক্রান্ত শিশুদের মাধ্যমেই সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। শয্যা সংকটের কারণে রোগীদের ঘনিষ্ঠ অবস্থান পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সতর্কবার্তাও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পরিস্থিতিকে “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ” হিসেবে চিহ্নিত করে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। এটি স্পষ্ট করে যে, সমস্যাটি কেবল স্থানীয় নয়; এটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য মানদণ্ডেও একটি গুরুতর সংকট।

সরকার ইতোমধ্যে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি গ্রহণ, জরুরি ভিত্তিতে ভ্যাকসিন আমদানি, হাসপাতালগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়-এই উদ্যোগগুলো কতটা দ্রুত, কার্যকর এবং সমন্বিতভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে? বাস্তবতা হলো, সংকটের গভীরতার তুলনায় পদক্ষেপের গতি এখনো সন্তোষজনক নয়।

নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এখন প্রয়োজন তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি উভয় দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়। প্রথমত, সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে ব্যাপক ও দ্রুত টিকাদান নিশ্চিতকরণে। কোনো শিশু যেন টিকার বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হাসপাতালগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে আইসোলেশন সুবিধা বৃদ্ধি এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা অপরিহার্য। তৃতীয়ত, টিকাবিরোধী অপপ্রচার কঠোরভাবে দমন করে বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এই প্রাদুর্ভাব কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি ব্যবস্থাপনার ঘাটতির প্রতিফলন। তাই দায় নির্ধারণ, ত্রুটি বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

শিশুরাই একটি জাতির ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎ যদি প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগের কাছে বারবার পরাজিত হয়, তবে তা কেবল স্বাস্থ্যখাতের ব্যর্থতা নয়-এটি সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। এখনই সময় দৃঢ়, দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপের; অন্যথায় এই মানবিক বিপর্যয় আরো গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। 
সানা/আপ্র/২৭/৪/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

বিচারহীনতা, অবহেলা ও নীতিহীনতার অবসান কবে
২৬ এপ্রিল ২০২৬

বিচারহীনতা, অবহেলা ও নীতিহীনতার অবসান কবে

রানা প্লাজা ধ্বংসস্তূপের নীরব প্রশ্ন-

দখলের বিষাক্ত ছায়ায় নদীর মৃত্যু, সময় এখন কঠোর পদক্ষেপের
২৫ এপ্রিল ২০২৬

দখলের বিষাক্ত ছায়ায় নদীর মৃত্যু, সময় এখন কঠোর পদক্ষেপের

নদী-এই শব্দটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে সভ্যতার প্রথম শ্বাস, কৃষির প্রথম ভোর, আর মানুষের বেঁচে থাকার অনিবার...

জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও নীতির পরীক্ষা
২৩ এপ্রিল ২০২৬

জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও নীতির পরীক্ষা

দেশজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকটের অভিঘাতে বিদ্যুৎ খাতে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, তা এখন আর কেবল একটি খাতভি...

নির্দেশনায় নয়, আস্থায় গড়তে হবে শিক্ষার ভবিষ্যৎ
২২ এপ্রিল ২০২৬

নির্দেশনায় নয়, আস্থায় গড়তে হবে শিক্ষার ভবিষ্যৎ

সংকটের সিঁড়ি পেরিয়ে এসএসসি পরীক্ষা

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই