দেশে ঝড়-বৃষ্টি বা ঘন মেঘ ছাড়াও বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে-যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। আবহাওয়াবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় “বোল্ট ফ্রম দ্য ব্লু” বা পরিষ্কার আকাশে বজ্রপাত, যা অনেকটা নিরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত।
জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলে বজ্রপাতে অন্তত ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে এদের মধ্যে কতজন পরিষ্কার আকাশে বজ্রপাতে মারা গেছেন তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। বজ্রপাত নিয়ে কাজ করা সংগঠন সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্ট্রোর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম (এসএসটিএএফ) জানিয়েছে, দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন।
আবহাওয়াবিদদের হিসাবে ২০১৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশে বজ্রপাতে মোট ১ হাজার ৯৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাক-বর্ষা মৌসুমে বিশেষ করে মার্চ থেকে মে-জুন সময়ে বজ্রপাতের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। এই সময় খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক ও বাইরে অবস্থানরত মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত ঘটে দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলার লেক মারাকাইবো অঞ্চলে, যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বছরে গড়ে ২৩৩টি বজ্রপাত হলেও প্রাণহানি তুলনামূলকভাবে খুবই কম। অথচ বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলে তুলনামূলক কম বজ্রপাত হলেও মৃত্যুর হার বেশি বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
আবহাওয়াবিদ শাহনাজ সুলতানা জানান, বজ্রপাতের একটি ধরন হলো পরিষ্কার আকাশে বজ্রপাত, তবে এর পরিমাণ কম। তিনি বলেন, “যে ধরনের বজ্রপাতই হোক না কেন, শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হওয়াই মূল বিষয়। বজ্রধ্বনি শোনার পর অন্তত আধা ঘণ্টা নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা প্রয়োজন।”
তিনি আরো বলেন, কৃষি কাজের মৌসুমে অনেকেই সতর্কতা উপেক্ষা করেন, বিশেষ করে সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোণার মতো এলাকায়। ফলে এ সময় দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। এসএসটিএএফ-এর সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা জানান, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত ১ হাজার ৯৮১ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালে মৃত্যু হয়েছে ৩৩০ জনের, ২০২৪ সালে ২৯৭ জন, ২০২৩ সালে ২৪৫ জন, ২০২২ সালে ২৭৭ জন, ২০২১ সালে ৩০৫ জন, ২০২০ সালে ২৩০ জন এবং ২০১৯ সালে ২৬৫ জন। তিনি বলেন, ঝড়-বৃষ্টির পাশাপাশি এখন পরিষ্কার আকাশেও বজ্রপাত হচ্ছে, তাই সচেতনতা ছাড়া বিকল্প নেই।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী দিনগুলোতেও বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে, বিশেষ করে বিকাল ও সন্ধ্যায় ঝুঁকি বেশি।
বজ্রপাত থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন-খোলা জায়গা, উঁচু গাছ বা বিদ্যুতের খুঁটির নিচে না থাকা, দ্রুত পাকা ভবনের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া এবং নদী বা জলাশয়ে অবস্থানরত নৌযান নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী অবস্থান, উচ্চ আর্দ্রতা, জলবায়ু পরিবর্তন, মেঘের দ্রুত গঠন এবং গাছপালা কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রোববার (২৬ এপ্রিল) দুপুর থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চার জেলায় বজ্রাঘাতে আট জনের মৃত্যু হয়েছে-গাইবান্ধায় চার জন, সিরাজগঞ্জে দুই জন, বগুড়ায় একজন ও পঞ্চগড়ে একজন।
সানা/আপ্র/২৭/৪/২০২৬