স্নেহেন্দু বিকাশ, পাইকগাছা প্রতিনিধি: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৬ আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ ঘুরপাক খাচ্ছে প্রায় এক লাখ সনাতনী ভোটকে কেন্দ্র করে—এমনই আভাস মিলছে মাঠপর্যায়ের জরিপ ও ভোটারদের অভিমতে।
এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে মূল লড়াইয়ে রয়েছেন বিএনপি মনোনীত এসএম মনিরুল হাসান বাপ্পী ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। শেষ মুহূর্তে হিন্দু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সমর্থন পেতে উভয় প্রার্থীই তৎপরতা জোরদার করেছেন।
রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংখ্যালঘু ভোটারদের কেন্দ্রে উপস্থিতির হারই জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে দুই প্রধান প্রার্থীই সনাতনী ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
অন্যদিকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগের সহানুভূতি পেতে সক্রিয় প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। পাশাপাশি সিপিবির প্রার্থী অ্যাডভোকেট প্রশান্ত মণ্ডল এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. আসাদুল্লাহ ফকিরও সম্মানজনক ভোটের আশায় প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন।
তবে মাঠপর্যায়ে সরকারি প্রচারণা ছাড়া সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনী প্রভাব তেমনভাবে পড়েনি—এমন চিত্রই লক্ষ্য করা গেছে।
সুন্দরবনঘেঁষা কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত খুলনা-৬ আসনে এবারের নির্বাচনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন—খুলনা জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব এসএম মনিরুল হাসান বাপ্পী (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর (লাঙ্গল), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির অ্যাডভোকেট প্রশান্ত মণ্ডল (কাস্তে-হাতুড়ি) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জেলা নেতা মো. আসাদুল্লাহ ফকির (হাতপাখা)।
নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ ভোটারদের অভিমত অনুযায়ী, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মধ্যে। দুই দলই ভোটারদের সমর্থন পেতে পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে গণসংযোগ ও নির্বাচনী জনসভা আয়োজনের মাধ্যমে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, দুই উপজেলার মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১৮ হাজার ৭৩৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১০ হাজার ২০৯ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৮ হাজার ৫২৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ জন।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ আসনে সনাতনী বা হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটার সংখ্যা ৯৪ হাজার ৬১৩ জন।
এই বিপুল ভোটব্যাংককে কেন্দ্র করেই বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীরা নানামুখী প্রতিশ্রুতি ও কৌশল গ্রহণ করেছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট ও সমর্থনের ওপরই শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয়ের পাল্লা ভারী হতে পারে।
তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের মধ্যে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ সম্প্রদায়ের কয়েকজন ভোটার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ৫৪ বছরে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসন দেখেছেন তারা। তাদের দাবি একটাই—নিরাপদ পরিবেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাপন। কিন্তু কোনো সরকার আমলেই তা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।
গত ৫ আগস্টের পরের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, সরকার পতন কিংবা ভোটের আগে-পরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। তাই সব প্রার্থীর কাছেই তারা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চান এবং সে আশ্বাস মিললে কেন্দ্রে যাওয়ার কথা ভাবছেন।
শতভাগ জয়ের আশাবাদ ব্যক্ত করে ৮ ফেব্রুয়ারি পাইকগাছায় শেষ নির্বাচনী জনসভায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এসএম মনিরুল হাসান বাপ্পী বলেন, উন্নত, সমৃদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়া বাংলাদেশ বিনির্মাণে দলের ৩১ দফা বাস্তবায়নের জন্য হিন্দু-মুসলিমসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষকে ধানের শীষে ভোট দিতে হবে। তিনি আরো বলেন, ‘৭১-এর পরাজিত ও ধর্মান্ধ শক্তি ক্ষমতায় এলে দেশ কারো জন্যই নিরাপদ থাকবে না।’
অন্যদিকে জয়ের প্রত্যাশা জানিয়ে ৯ ফেব্রুয়ারি বিকেলে পাইকগাছা সরকারি কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট চান। তিনি বলেন, ‘দেশ থেকে এক স্বৈরাচারকে বিদায় দেওয়া হয়েছে, আমরা আর কোনো স্বৈরশাসক দেখতে চাই না।’ গত ১৭ মাসে নির্বাচনী এলাকায় একটি দলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও নৈরাজ্যের অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় এলে দেশে হিন্দু-মুসলিম সবাই নিরাপদে বসবাস করবে। আমরা দুর্নীতি ও সন্ত্রাস করব না, কাউকে করতেও দেবো না।’
সানা/এসি/১০/২/২০২৬