গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ২২ মার্চ ২০২৬

মেনু

স্বাধীন সুর বনাম শুদ্ধ স্বরলিপি- নজরুল সঙ্গীতের আত্মা কী বাঁধনে হারাবে?

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ২০:১৪ পিএম, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৬:১৩ এএম ২০২৬
স্বাধীন সুর বনাম শুদ্ধ স্বরলিপি- নজরুল সঙ্গীতের আত্মা কী বাঁধনে হারাবে?
ছবি

ছবি সংগৃহীত

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান কেবল কিছু সুরবদ্ধ সংগীত নয়। এ এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। বিদ্রোহ, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা, মানবতা ও সাম্যের যে বহুবর্ণিল প্রকাশ নজরুল সঙ্গীতে আমরা পাই; এর প্রাণশক্তির বড় অংশই নিহিত আছে সুরের স্বাধীনতায়। অথচ আজ ওই স্বাধীন সুর বনাম নজরুল ইন্সটিটিউট প্রণীত তথাকথিত ‘শুদ্ধ স্বরলিপি’র দ্বন্দ্বে নজরুল সঙ্গীতের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

নজরুল নিজেই ছিলেন সুরের ক্ষেত্রে আপসহীন অথচ উদার। তিনি রাগ-রাগিণী জানতেন, শাস্ত্র মানতেন, কিন্তু শাস্ত্রকে কখনোই শিল্পের শেকল হতে দেননি। একাধিক সাক্ষ্যে ও স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়-নজরুল গানের মূল সুর ঠিক রেখে শিল্পীর কণ্ঠ, আবেগ ও ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী পরিবেশনার স্বাধীনতা দিতেন। ফলে তাঁর গান একেক শিল্পীর কণ্ঠে একেক রূপে ধরা দিয়েছে, কিন্তু আত্মা হারায়নি; বরং সেই বহুরূপী প্রকাশই নজরুল সঙ্গীতকে করেছে গণমানুষের গান।

মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সচিন দেব বর্মণ, আঙ্গুরবালা দেবী, ইন্দুবালা দেবী, অঞ্জলি মুখোপাধ্যায়, ফিরোজা বেগম, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রখ্যাত শিল্পীদের কণ্ঠে যে নজরুল সঙ্গীত আমরা যুগ যুগ ধরে শুনে আসছি, সেগুলোই তো আমাদের পড়ষষবপঃরাব সবসড়ৎু বা সামষ্টিক শ্রুতিস্মৃতির অংশ। এই সুরগুলোই নজরুল সঙ্গীতকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে গেছে, ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। আজ হঠাৎ করে যদি বলা হয়- এই সুরগুলো ‘ভুল’ আর নতুন করে নির্ধারিত স্বরলিপিই একমাত্র ‘শুদ্ধ’-তাহলে প্রশ্ন ওঠে, শুদ্ধতা কী কেবল কাগজে বন্দি স্বরলিপিতে, নাকি মানুষের কণ্ঠে বহমান ঐতিহ্যেও?

নজরুল ইনস্টিটিউটের ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। সংরক্ষণ, গবেষণা, দলিলীকরণ- এসব কাজ না হলে অনেক গান, অনেক তথ্য হারিয়ে যেতো। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়- যখন সংরক্ষণ রূপ নেয় নিয়ন্ত্রণে। বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ইনস্টিটিউটের স্বরলিপিতে গানের সুর এমনভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, যা দীর্ঘদিনের প্রচলিত সুরের সঙ্গে মেলে না; বরং অনেক সময় তা শিল্পীর কণ্ঠে আনকোরা, কৃত্রিম ও আবেগহীন শোনায়। সুর হয়তো ‘শুদ্ধ’। কিন্তু গান প্রাণহীন। এই সংকট আরো গভীর হয়েছে বাংলাদেশে বেতার ও টেলিভিশনের অডিশন ও সম্প্রচারে নজরুল ইনস্টিটিউটের শুদ্ধ সুর বাধ্যতামূলক করার ফলে।

তরুণ শিল্পীরা আজ দ্বিধায়- যে সুর শুনে বড় হয়েছেন, যে সুরে গান ভালোবাসতে শিখেছেন; সেটি গাইলে পরীক্ষায় বাদ পড়বেন; আর যে সুর গাইতে বাধ্য হচ্ছেন, তা তাঁদের নিজেরও আপন মনে হচ্ছে না। এর ফল কী? আগামী প্রজন্ম ধীরে ধীরে প্রচলিত সুর ভুলে যাবে, এবং নজরুল সঙ্গীত একরকম একঘেয়ে, পরীক্ষাভিত্তিক ও প্রাণহীন ধারায় আটকে পড়বে। এখানে মূল প্রশ্নটি নান্দনিক ও দার্শনিক- একটি গানের ‘ভবিষ্যৎ’ কীভাবে নিরাপদ থাকে? কঠোর নিয়মে না কি স্বাভাবিক প্রবাহে? ইতিহাস বলে, সংগীত বাঁচে মানুষের কণ্ঠে, অনুভবে ও স্মৃতিতে। যদি যুগ যুগ ধরে শোনা সুরকে হঠাৎ ‘ভুল’ বলে বাতিল করা হয় এবং তার চেয়ে কম গ্রহণযোগ্য সুর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেই গান জনপ্রিয়তা হারাবে। জনপ্রিয়তা হারালে তা কেবল আর্কাইভে বেঁচে থাকবে, জীবন্ত সংস্কৃতি হিসেবে নয়।

নজরুল নিজে যে বিশ্বাস রেখে গেছেন, সেটিই এখানে পথনির্দেশক হওয়া উচিত। তিনি মূল সুরের কাঠামো বজায় রেখে শিল্পীর স্বকীয় পরিবেশনার স্বাধীনতায় আস্থা রেখেছিলেন। ওই আস্থার ফলেই তাঁর গান সময় অতিক্রম করেছে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। আজ ওই আস্থাকে অস্বীকার করে যদি আমরা একমাত্রিক ‘শুদ্ধতা’ চাপিয়ে দিই, তাহলে আমরা নজরুলের চেতনার সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করবো। তাই প্রয়োজন ভারসাম্য। স্বরলিপি থাকবে- সংরক্ষণের জন্য, গবেষণার জন্য, রেফারেন্স হিসেবে। কিন্তু তা যেন একমাত্র সত্য হিসেবে চাপিয়ে না দেওয়া হয়। প্রচলিত, জনপ্রিয় ও শ্রুতিপ্রতিষ্ঠিত সুরগুলোকেও সমান মর্যাদা দিতে হবে। শিল্পীর স্বাধীনতা, শ্রোতার স্মৃতি এবং গানের আত্মা-এই তিনের সমন্বয়েই নজরুল সঙ্গীতের ভবিষ্যৎ নিরাপদ।

নজরুল সঙ্গীত কোনো জাদুঘরের নিদর্শন নয়; এটি এক জীবন্ত নদী। সেই নদীকে বাঁধ দিয়ে থামালে হয়তো মানচিত্রে থাকবে, কিন্তু প্রবাহ হারাবে। আর প্রবাহ হারালে-নজরুলও হারাবেন, আমরাও।

লেখক: সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিককর্মী

কেএমএএ/আপ্র

সংশ্লিষ্ট খবর

এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পদ্ধতির সংস্কার প্রসঙ্গে
১৭ মার্চ ২০২৬

এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পদ্ধতির সংস্কার প্রসঙ্গে

ওমর আলী: বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থা চলছে। আওয়ামী লীগ সরকারের জমানায়...

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: মধ্যপ্রাচ্যে ঝুঁকি ও পরিণতি
০৭ মার্চ ২০২৬

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: মধ্যপ্রাচ্যে ঝুঁকি ও পরিণতি

ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকারমার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এ...

ভূমির বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি: সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ভূমির বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি: সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকার======ভূমি ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থ’ার সবচেয়ে দীর্ঘস...

প্রত্যাশিত গণরায়, বাংলাদেশে নতুন সরকার এবং উন্নয়ন ও সুশাসনে করণীয়
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রত্যাশিত গণরায়, বাংলাদেশে নতুন সরকার এবং উন্নয়ন ও সুশাসনে করণীয়

জগদীশ সানা: শেষ হলো বাংলাদেশের প্রত্যাশিত জাতীয় নির্বাচন।  যাত্রা শুরু করলো নতুন সরকার। জাতীয় ন...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই