আসিফ মুনীর
প্রবাদ আছে, মানুষ অভ্যাসের দাস। জীবনে কোনো কিছুতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে স্বস্তি আর আত্মবিশ্বাস কাজ করে। নতুন কিছু বা পরিবর্তনের মধ্যে অজানার আশঙ্কা হাতছানি দেয়। ওই পরিবর্তনে ভালো-মন্দ উভয়ই থাকতে পারে- সেই আশঙ্কা। আবার পরিবর্তনের সাথে নিজেকে কতটা খাপ খাইয়ে নেওয়া যাবে বা সেটা করতে কতটা বেগ পেতে হবে, এ জন্যও আশঙ্কা কাজ করে। অন্যদিকে আকর্ষণীয় নতুন জীবনের হাতছানি অনিশ্চিত হলেও মানুষকে সেদিকে ধাবিত করতে উদ্বুদ্ধ করে।
দেশান্তরী মানুষের প্রাথমিক সিদ্ধান্তেও এরকম আশা-নিরাশা, নিশ্চিত-অনিশ্চিত, আকর্ষণ-বিকর্ষণ কাজ করে। দেশান্তর সাময়িক বা স্থায়ী, উভয় ক্ষেত্রেই সেই দোলাচল কাজ করে। যেমন ধরা যাক, সত্তরের দশকে মধ্যপ্রাচ্যে গমনকারী প্রথম ধাপের অভিবাসী কর্মী। জানা গেছে, সৌদি আরবে কর্মরত কয়েকজন পেশাজীবী বাংলাদেশি প্রথম জানতে পারেন সেখানে বিদেশি কর্মীর চাহিদা আছে। দেশে ও সৌদিতে নিয়োগকর্তা, সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে সমন্বয় করে তারা ধীরে ধীরে খণ্ডকালীন চুক্তির ভিত্তিতে কর্মীদের সৌদি আরব যাওয়ার সুযোগ করে দিতে থাকেন।
ওই সার্থক শ্রম অভিবাসনের জের ধরে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে বেসরকারি খাতে বিগত ৫০ বছর ধরে শ্রম অভিবাসন চলমান। বর্তমানে সারা বিশ্বে বাংলাদেশিদের শ্রম অভিবাসনের ৭৭ শতাংশ হয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়, যার সিংহভাগ সৌদি আরবে। এমনকি সরকারি কোনো চুক্তি না থাকলেও ব্যক্তি ও রিক্রুটিং এজেন্সিদের উদ্যোগে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রম অভিবাসন চলমান।
যদি ইতালিতে বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতার দিকে তাকাই, তাহলে সেখানে স্থায়ী অভিবাসনের শুরু আশির দশকের শেষ দিকে। এদের মধ্যে একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকেই ভাগ্য আরও সুপ্রসন্ন করতে বৈধ এবং অবৈধ, দুইভাবেই ইতালি প্রবেশ করে, একটা পর্যায়ে স্থায়ী বাসিন্দার অধিকার পায় এবং পরিবারকেও তাদের কাছে নিয়ে আসে।
ইতালিতে প্রথম বাংলাদেশিদের মধ্যে মাদারীপুর ও শরীয়তপুরের মানুষ ছিল। ৪৫ বছরে এই দুই অঞ্চলের বিরাট অংশের পরিবারের কেউ না কেউ ইতালি, স্পেন বা পর্তুগালে। যেমন পঞ্চাশের দশকে বিলাতে অভিবাসীদের বেশিরভাগ সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ জেলার। এসব দেশে বেশির ভাগ বাংলাদেশি কাছাকাছি এবং দেশের নিজ এলাকার মতো পরিবেশেই থাকেন।
পঞ্চাশের দশকে বিলাতে অভিবাসীদের বেশিরভাগ সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ জেলার। এসব দেশে বেশির ভাগ বাংলাদেশি কাছাকাছি এবং দেশের নিজ এলাকার মতো পরিবেশেই থাকেন। অর্থাৎ স্থায়ী অভিবাসীরা এক জায়গায় থিতু হয়ে থেকে যান এবং দেশের মতো পরিবেশ সৃষ্টি করেন যেন বড় ধরনের আর কোনো পরিবর্তন না আসে জীবনে। আবার অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক কর্মীরাও যে দেশ পরীক্ষিত, চেনা অনেকেই গেছেন, সেখানেই যেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের বাইরে খুব কম দেশেই অভিবাসী কর্মী যান। কারণ অচেনা-অজানা দেশে ঝুঁকি নিতে চান না। এ জন্য কাজের ক্ষেত্র বা দেশ বিস্তৃত করা সহজাতভাবে হয় না বা হবে না। বাংলাদেশের মানুষ জন্মস্থান ও পরিবারকেন্দ্রিক এবং সহজাতভাবে অ্যাডভেঞ্চারপ্রবণ নয়, প্রবাস জীবনে চেনা গণ্ডির বাইরে বাধ্য না হলে যেতে নারাজ।
ওই কয়েকটি দেশের বাইরেও বাংলাদেশিরা কাজ ও বসতির সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছেন। সেটি বিস্তৃত হয়নি পরিবর্তনের অনীহা থেকে। আবার ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রগামী অভিবাসীদের একটি অংশ বৈধ অভিবাসনের পথ বিসর্জন দিয়ে অন্য নানাভাবে প্রবাসে থাকার বা অনুমতির চেষ্টা করে যান, যা একসময় শুধু প্রত্যাখ্যাত হয় তা না, অন্যদের বৈধ অভিবাসনকেও সন্দেহযুক্ত বা নিরুৎসাহিত করে ফেলেন।
অন্যদিকে দেশের অর্থনীতি ও বেকারত্ব মোকাবিলায় একটি বড় কৌশল হতে পারে শ্রম অভিবাসনের শ্রমের খাত এবং দেশ সম্প্রসারণ। কারণ ৪০-৫০ বছরে সেইসব গুটিকয়েক দেশে লাখ লাখ বাংলাদেশি গেছেন এবং এদের অনেকেই স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসলেও সামগ্রিকভাবে এইসব দেশে বাংলাদেশি অভিবাসীদের সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে অন্যান্য দেশের অভিবাসীরাও যাচ্ছেন- যারা বাংলাদেশিদের থেকে দক্ষ এবং প্রতিযোগীমূলক।
কোনো কোনো দেশে অনুমতিবিহীন অবস্থান ও কাজ করার জন্য অনেক বাংলাদেশিদের বাধ্য হয়ে ফেরত চলে আসতে হচ্ছে। অথচ নতুন কোনো দেশে কাজ খোঁজার পথ অনেকেই জানেন না; এমনকি যে স্থানীয় সাব-এজেন্ট বা স্বজন অভিবাসীপ্রত্যাশীকে সহায়তা করেন, তিনিও জানেন না এবং জানতেও চান না। ক্রমেই পরিচিত দেশগুলোয় শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়ার ওপর নজরদারি বাড়ছে এবং নতুন অভিবাসনের জন্য শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে আসছে। এক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ ব্যক্তি পর্যায়ের ব্যাপক নিজ উদ্যোগে অভিবাসন প্রক্রিয়ার পাশাপাশি শ্রম অভিবাসনের প্রেক্ষাপট বৃদ্ধির উদ্যোগ কীভাবে নেওয়া যায়। এই উদ্যোগ সম্ভব এবং কঠিন নয়।
সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর ও অভিবাসন প্রক্রিয়ার রিক্রুটিং এজেন্সিরা ওই সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি কোনো কর্মকৌশল দৃশ্যত অনুসরণ করেন না। নতুন কোন কারিগরি দক্ষতা, নতুন কোন দেশে অভিবাসনের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ নেই; যা না হলে সহজলভ্য এই নতুন শ্রম বাজার কিছুদিনের মধ্যেই হারিয়ে যায়। অনেক সময় প্রবাসে বাংলাদেশ মিশনগুলোয় নতুন শ্রম বাজার সম্ভাবনা খুঁজতে ঢাকা থেকে নির্দেশ করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের বাইরে খুব কম দেশেই অভিবাসী কর্মী যান। কারণ অচেনা-অজানা দেশে ঝুঁকি নিতে চান না। এ জন্য কাজের ক্ষেত্র বা দেশ বিস্তৃত করা সহজাতভাবে হয় না বা হবে না। ওই অনুযায়ী প্রতিবেদন নির্দিষ্ট দপ্তরে পাঠানোও হয়। কিন্তু ওই প্রতিবেদনের প্রস্তাব কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। সম্ভাবনা যাচাই করতে অতীতে সরকারি কর্মকর্তারা বিদেশ গেছেন, কিন্তু সেই প্রতিবেদনও বাস্তবায়ন আবার রিক্রুটিং এজেন্সিরাও নতুন শ্রম বাজারের উদ্যোগ নিলেও অভিবাসীরা যেন অনিয়মিত হয়ে সেই শ্রমবাজার নষ্ট করে না ফেলেন, সেরকম কোনো উদ্যোগও নেন না। অথচ সরকার-রিক্রুটিং এজেন্সিরা এ ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিলে তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
সুদূরপ্রসারী উদ্যোগে সর্বাগ্রে দরকার, স্থায়ীভাবে শ্রমবাজার গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা। এই কেন্দ্র যৌথভাবে সরকারি-প্রাইভেট সেক্টর দ্বারা পরিচালিত হবে এবং সেটির পারস্পরিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এই কেন্দ্রের গবেষণার ভিত্তিতে নতুন কোনো দেশ ও যুগোপযোগী কারিগরি প্রশিক্ষণের প্রস্তাব আসলে সেই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
ওই গবেষণার সবসময় বিদেশ ভ্রমণের প্রয়োজন নেই—অনলাইন মাধ্যম, প্রবাস মিশনে, বাংলাদেশে সেই দেশের মিশন এবং ওইসব দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমেই অনেক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা সম্ভব। যেসব সম্ভাবনাময় দেশে বাংলাদেশ মিশন নেই, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মিশন খোলার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। একই সাথে নতুন দেশ, পেশা সম্পর্কে গ্রাম পর্যায়ে জনগণের মাঝে সহজ ও সঠিক তথ্য প্রদান করা দরকার। এই কাজে বিশেষ করে তথ্য ও সম্প্রচার, সংস্কৃতি এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাথে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত প্রচারণা দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়ন করা উচিত।
কথায় বলে, সাধ আছে সাধ্য নেই, আবার এও প্রবাদ আছে, ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। শ্রম বাজার সম্প্রসারণ জটিল ভাবা অবান্তর। কারণ কার্যকরী পদক্ষেপ নিলে এই সম্প্রসারণ বাস্তবসম্মত। সাধটা থাকতে হবে। তবে উপায় নিশ্চিত করা যাবে। এই সম্প্রসারণ না হলে ক্রমেই শ্রমবাজার আরও সংকুচিত হয়ে যাবে আর রেমিট্যান্স কমতে থাকলে সেই অর্থনৈতিক চাপ দেশে সব শ্রেণির মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠবে।
লেখক: অভিবাসন বিশেষজ্ঞ
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র
০১.০২.২৬