জগদীশ সানা: শেষ হলো বাংলাদেশের প্রত্যাশিত জাতীয় নির্বাচন। যাত্রা শুরু করলো নতুন সরকার। জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের জনগণ তাদের মতামত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় ক্ষমতায় এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নির্বাচন-পরবর্তী এই সময়টি শুধু বিজয়ের আনন্দের নয়; বরং দায়িত্ব, জবাবদিহিতা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রগঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জনগণ প্রত্যাশা করছে-নতুন সরকার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে একটি আদর্শ, উন্নয়নমুখী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ। কৃষি, শিল্প, রেমিট্যান্স, তথ্যপ্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ-সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নতুন সরকারের সামনে রয়েছে কিছু মৌলিক করণীয়, যা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশ আরো স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধির পথে এগোতে পারে।
জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা: নির্বাচন শেষ হলেও রাজনৈতিক বিভাজন যেন না বাড়ে-এটি নিশ্চিত করা জরুরি। নির্বাচিত সরকারকে প্রথমেই বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও সব অংশীজনের সঙ্গে সংলাপ শুরু করতে হবে। প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতি, সহনশীলতা এবং সমঝোতার সংস্কৃতি গড়ে তুললে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে। রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রতিশোধপরায়ণতার পরিবর্তে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা তৈরি করতে হবে। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে। জনগণ প্রত্যাশা করে-সরকার সব নাগরিককে সমানভাবে দেখবে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো হবে স্বচ্ছ ও ন্যায্য।
সুশাসন ও দুর্নীতি দমন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। সরকারি ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন, নিয়োগ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা জরুরি। স্বাধীন ও শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন, তথ্য অধিকার বাস্তবায়ন এবং ই-গভর্নেন্স ব্যবস্থার উন্নয়ন-এসব পদক্ষেপ প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বাড়াবে। জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই দৃশ্যমান কিছু সুশাসনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে-যেমন সরকারি সেবায় ডিজিটাল পদ্ধতি সম্প্রসারণ, টেন্ডার প্রক্রিয়া অনলাইনে আনা এবং অভিযোগ ব্যবস্থাকে কার্যকর করা।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও কর্মসংস্থান: অর্থনীতি এখন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখে। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ-এসব মোকাবিলায় নতুন সরকারকে দ্রুত কার্যকর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিতে হবে। যেমন-ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ; কৃষি খাতে ভর্তুকি ও প্রযুক্তি সহায়তা; শিল্প ও রপ্তানি খাতের বহুমুখীকরণ; তথ্যপ্রযুক্তি ও স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগ।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা সহায়তা বাড়াতে হবে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও স্থানীয় বাজার উন্নয়ন প্রয়োজন।
শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন: একটি উন্নয়নশীল দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে রূপ দিতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার অপরিহার্য। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার করতে হবে। কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা জরুরি। ডিজিটাল শিক্ষা ও অনলাইন প্রশিক্ষণ প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ করলে শহর-গ্রামের বৈষম্য কমবে এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা: সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়ন, চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ এবং ওষুধের সহজলভ্যতা বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্যবীমা বা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে। বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, বিধবা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ভাতা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এতে সামাজিক বৈষম্য কমবে এবং মানবিক রাষ্ট্রের ভিত্তি দৃঢ় হবে।
অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন: সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ, পানি ও ইন্টারনেট-এসব অবকাঠামো উন্নয়ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। তবে উন্নয়ন যেন পরিবেশবান্ধব ও টেকসই হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নদী ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন এবং নগর পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। গ্রাম ও শহরের মধ্যে উন্নয়নের ভারসাম্য রাখতে স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতায়ন করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে বাজেট ও পরিকল্পনায় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ: আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি। পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার সংস্কার, মামলার জট কমানো এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। মানবাধিকার রক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি উন্নত হবে।
পররাষ্ট্রনীতি ও বৈশ্বিক সম্পর্ক: আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী শ্রমবাজার উন্নয়ন-এসব ক্ষেত্রে সক্রিয় কূটনীতি প্রয়োজন। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে স্থিতিশীল নীতি ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা: গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করলে সরকারের নীতিনির্ধারণ আরো কার্যকর হবে। সমালোচনাকে গ্রহণ করে সংশোধনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। স্বাধীন গণমাধ্যম গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে এবং জনগণের আস্থা বাড়ায়।
গণরায়ের মাধ্যমে নতুন দায়িত্ব পেয়েছে সরকার। এখন সময় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের। উন্নয়ন, সুশাসন, ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি-এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব। বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দক্ষ প্রশাসন এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলে দেশকে একটি আদর্শ ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব। নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা-তারা যেন দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে সেই পথচলা নিশ্চিত করে।
লেখক: উন্নয়ন পরামর্শক, কবি ও কথাশিল্পী
সানা/আপ্র/১৭/২/২০৬