অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের অধ্যায় শেষ হলো এক উচ্চাভিলাষী বিদায়ী ভাষণের মধ্য দিয়ে। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং ‘জুলাই সনদ’-কে তাঁর সরকারের সর্ববৃহৎ অর্জন হিসেবে তুলে ধরেছেন। প্রশ্ন হলো-এই দুই মাইলফলকের মধ্যবর্তী পথচলা কি একটি পূর্ণাঙ্গ রূপান্তরের গল্প, নাকি অর্ধসমাপ্ত এক প্রক্রিয়ার সূচনা?
নিঃসন্দেহে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে দৃশ্যমান সাফল্য। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, আস্থাহীনতা ও সংঘাতের পর একটি তুলনামূলক সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় ইতিবাচক বার্তা বহন করে। হার-জিতের ফলাফলে প্রায় সমান ভোটের প্রতিফলন রাজনৈতিক ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়। এই নির্বাচন ভবিষ্যতের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড স্থাপন করেছে-এ কথা অস্বীকারের সুযোগ নেই।
কিন্তু নির্বাচন আয়োজনই কি রূপান্তরের সমার্থক? ‘জুলাই সনদ’ গণভোটে অনুমোদিত হয়েছে-এটি একটি রাজনৈতিক প্রতীক ও প্রতিশ্রুতি। তবে বাস্তবতা হলো, সনদের বহু বিধান এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুসংহত হয়নি। সংবিধান ও রাষ্ট্রকাঠামোর গভীর সংস্কারের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার অনেকটাই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। আইন প্রণয়ন হয়েছে, নির্বাহী আদেশ জারি হয়েছে-কিন্তু কার্যকারিতা, জবাবদিহি ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের প্রশ্নে এখনো সুস্পষ্ট ফলাফল দৃশ্যমান নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের নেতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে আস্থার সংকট, কর্মকর্তাদের বিভক্তি এবং নীতি বাস্তবায়নে ধীরগতি-এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সময় লেগেছে। অনেক ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিল কেন্দ্রাভিমুখী; রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শের পরিসর পর্যাপ্ত ছিল কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। ফলত কিছু সংস্কার উদ্যোগ জনসম্পৃক্ততার ঘাটতিতে ভুগেছে।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের চাপ এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার মতো চ্যালেঞ্জগুলো তেমন প্রশমিত হয়নি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয়তার ঘোষণা থাকলেও, সাধারণ নাগরিকের জীবনমানে দৃশ্যমান উন্নতি সীমিত ছিল-এ সমালোচনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তৃতীয়ত, বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্নে সরকারের দৃঢ় অবস্থান প্রশংসনীয় হলেও, বিরোধী মহলে অভিযোগ ছিল-কিছু ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গুম-খুনের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও, তার গতি ও নিরপেক্ষতা নিয়ে মতভেদ রয়ে গেছে। রূপান্তরকালে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি তা যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়-এই ভারসাম্য রক্ষা সবসময় সহজ ছিল না।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হতে সময় নিয়েছে। উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মাঝে মাঝে সহিংসতা ও উত্তেজনার ঘটনা দেখিয়েছে-রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক আস্থার পুনর্গঠন ছিল এক জটিল প্রক্রিয়া।
তবে সমালোচনার মধ্যেও একটি মৌলিক সত্য অস্বীকার করা যায় না-এই অন্তর্বর্তী সময়টি ছিল একটি রূপান্তরকাল। স্বৈরাচারী চর্চা রোধ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন-এসব পদক্ষেপ ভবিষ্যতের পথ নির্মাণে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু রূপান্তর তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রোথিত হয় এবং পরবর্তী সরকার তা ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেয়।
অতএব, ‘জুলাই সনদ’ থেকে ত্রয়োদশ নির্বাচন পর্যন্ত যাত্রা একদিকে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, অন্যদিকে অসমাপ্ত কাজের দীর্ঘ তালিকাও রেখে গেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি অর্জন-কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি অর্ধসমাপ্ত রূপান্তর। এখন দায়িত্ব নতুন সরকারের-এই সূচনাকে টেকসই কাঠামোয় রূপ দেওয়া, যাতে গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের দিনে নয়, প্রতিদিনের রাষ্ট্রচর্চায় প্রতিফলিত হয়।
ইতিহাসের বিচারে এই অধ্যায়কে মূল্যায়ন করা হবে কেবল ভাষণের উচ্চারণে নয়, বরং সেই উচ্চারণ কতটা বাস্তবে রূপ পেয়েছে-তার ওপরই।
সানা/আপ্র/১৭/২/২০৬