দীর্ঘ স্বৈরশাসন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পটপরিবর্তনের সূচনা করেছিল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তারই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি ছিল গণতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ভোটের অন্তর্ভুক্তি ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সার্বিকভাবে শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া জাতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত বেসরকারি ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২৯৭ আসনের মধ্যে ২০৯টিতে জয় পেয়েছে। তাদের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও এবার প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, যারা পেয়েছে ৬৮টি আসন। দুই-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি এই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপিকে সরকার গঠনের স্পষ্ট ম্যান্ডেট দিয়েছে। দলটির নেতারা একে ‘গণতন্ত্রের বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে গণভোট। সেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সুস্পষ্ট প্রাধান্য ইঙ্গিত করছে যে জনগণ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে গণভোটের প্রশ্ন ও প্রক্রিয়া নিয়ে যে বিতর্ক উত্থাপিত হয়েছে, তা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সংস্কারের বৈধতা শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নয়, স্বচ্ছতা ও জনআস্থার ওপরও নির্ভরশীল।
নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় বিজয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষের বক্তব্যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা স্পষ্ট হয়েছে। বিএনপি বলছে, তারা আন্দোলনের সঙ্গীদের সঙ্গে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন করতে চায়। অন্যদিকে জামায়াত ফলাফলে ‘গরমিল’ ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। গণতন্ত্রে বিরোধী কণ্ঠের ভূমিকা অপরিহার্য; তবে তা যেন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতর থেকেই হয়-এ প্রত্যাশা সবার।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও এসেছে অভিনন্দন বার্তা-যা নতুন সরকারের সামনে কূটনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য ও আস্থা পুনর্গঠন।
দীর্ঘদিন পর এমন এক সংসদ গঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে পুরোনো দ্বিমুখী মেরুকরণের চেহারা বদলাচ্ছে। ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন বিএনপির জন্য যেমন ঐতিহাসিক মুহূর্ত, তেমনি এটি একটি বড় দায়ও। গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ছিল জবাবদিহি, সুশাসন ও নাগরিক অধিকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। সেই চেতনাকে বাস্তবে রূপ দিতে না পারলে এই বিজয়ের তাৎপর্য ম্লান হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ আজ এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রয়োজন প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, নীতিনিষ্ঠ প্রতিযোগিতা; প্রয়োজন সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঔদ্ধত্য নয়, সহনশীল নেতৃত্ব। বিজয়ী দল ও বিরোধী উভয়ের দায়িত্ব-এই নির্বাচনের ইতিবাচক বার্তাকে ধারণ করে একটি সুস্থ, অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্রের পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়া। তাহলেই বলা যাবে, এই ভোট সত্যিই মুক্তির এবং গণতন্ত্রের পথে যাত্রার সূচনা।
সানা/আপ্র/১৫/২/২০২৬