বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি দেশীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মঞ্চ। আজ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-ক্যালেন্ডারে এটি একটি দিন মাত্র, কিন্তু ইতিহাসের পাতা এ দিনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারে। প্রশ্ন শুধুই কে জিতবে বা কে হারবে তা নয়। প্রধান প্রশ্ন হলো-ভোট কি সত্যিই জনগণের রায় প্রতিফলিত করবে, নাকি এটি আবারো রাজনৈতিক অঙ্গনের খেলা হয়ে যাবে?
জুলাই ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর স্বৈরশাসনের পতনের মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তা পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে ভোটবিহীন বা প্রশ্নবিদ্ধ অভিজ্ঞতার পর মানুষ চেয়েছে অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহিংসতামুক্ত ও নিরাপদ ভোট প্রক্রিয়া। কিন্তু নির্বাচনের আগেই শঙ্কা এবং অনিশ্চয়তা জনমনে ঘনীভূত হয়েছে। সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা-এসব নিয়েই মানুষ উদ্বিগ্ন।
অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা যথেষ্ট নয়। প্রকাশ্য রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মাত্রা কমেছে, কিছু প্রশাসনিক সংস্কার হয়েছে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। তবে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা, সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতার ঘাটতি-এসব কারণে সাধারণ মানুষের আস্থা কমেছে।
নির্বাচনের কাঠামোও বিতর্কের মুখে। আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন আয়োজনকে অনেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক মনে করছেন না। নির্বাচন কমিশন সমান সুযোগের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে মূল বিরোধী শক্তি এবং ছোট দলগুলোকে প্রান্তিক করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ এবং ফল প্রত্যাখ্যানের সম্ভাবনা নিয়ে অভিযোগ দেখা দিয়েছে। এমন পরিবেশে ভোট-পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
তবু, শেষ মুহূর্তে দেশি-বিদেশি জনমত জরিপ আজকের নির্বাচনের আগ্রহ ও কৌতূহলকে অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। এসব জনমত বিএনপির দিকেই বেশি ঝুঁকছে। এটি কেবল দলের প্রতি আস্থা নয়; বরং সুষ্ঠু ভোটবিহীন দেশে দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, ভোটাধিকার হরণ এবং রাজনৈতিক বদ্ধতার বিরুদ্ধে জনগণের এক প্রতিবাদী মনোভাব। ভোটদানে মানুষের এই প্রত্যাশা স্পষ্ট-নিজের রায় দিতে চায় এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরতে চায়।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পুনর্গঠন এই নির্বাচনের সফলতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোট হলে উদিত হবে রাজনৈতিক পুনরুদ্ধারের নতুন সূর্য। ব্যর্থ হলে, জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৈরি হওয়া আশার জায়গা ভেঙে পড়বে। মনে রাখা দরকার-ভোট কেবল সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, আস্থা এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ভোটের দিন দেশে গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস কি পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে, না কি এটি আবারো অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দেবে-এটাই মূল প্রশ্ন।
বাংলাদেশ আজ ভোটের উৎসবে মাতবে। দেশের নাগরিকরা এখন শুধু ভোটের ফলাফল নয়, একটি বিশ্বাসযোগ্য, নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ ভোট প্রক্রিয়া আশা করছে। সবার প্রত্যাশা-এই ভোটে জিতে যাক বাংলাদেশ। আমাদেরও অভিন্ন-আজকের প্রত্যাশা।
সানা/আপ্র/১২/২/২০২৬