ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের জাতির উদ্দেশে ভাষণদান একটি নতুন ও তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক চর্চা হিসেবে সামনে এসেছে। নির্বাচনী প্রচারণায় এটি যেমন রাষ্ট্রীয় প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তেমনি দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান, আত্মসমালোচনা ও ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি বিশ্লেষণের সুযোগও তৈরি করে।
এই ধারাবাহিকতায় সম্প্রচারিত ভাষণগুলোর মধ্যে বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভাষণে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল-অতীত শাসনামলের ‘অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটি’র জন্য প্রকাশ্য দুঃখপ্রকাশ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমা প্রার্থনা বা দায় স্বীকার খুব একটা দেখা যায় না। সে বিবেচনায় এটি একটি ব্যতিক্রমী বার্তা। একই সঙ্গে তিনি আইনের শাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ধর্মীয় সহনশীলতার কথা বলেছেন, যা মূলধারার গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু দুঃখপ্রকাশ নয়-সেই ভুলগুলোর প্রকৃতি কী ছিল, সেগুলো থেকে কীভাবে শিক্ষা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি রোধে কী প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা থাকবে-এসব প্রশ্নের উত্তরই ভোটারদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তাঁর ভাষণে ‘নতুন বাংলাদেশ’ নির্মাণের আকাঙক্ষা, রাষ্ট্র সংস্কার, দুর্নীতি ও পরিবারতন্ত্রবিরোধী অবস্থান এবং ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে নাগরিক অধিকারের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও কাঙিক্ষত রাষ্ট্রকাঠামোর বর্ণনা থাকলেও দলটির অতীত ভূমিকা, বিশেষ করে ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়গুলো নিয়ে কোনো আত্মসমালোচনা বা দায় স্বীকার অনুপস্থিত ছিল। ফলে ভাষণের রাজনৈতিক পরিপূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
দুটি ভাষণ মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট-বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই আস্থা অর্জনের জন্য ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি অতীতের দায় স্বীকার, স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতার প্রয়োজন রয়েছে। ভোটাররা কেবল সুন্দর ভাষণ নয়, বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক নৈতিকতার স্পষ্ট প্রমাণ দেখতে চান।
নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কার ও পরিণত গণতন্ত্রের পরীক্ষাও। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণগুলো সেই পরীক্ষার একটি সূচনামাত্র। শেষ পর্যন্ত জনগণই নির্ধারণ করবেন-কে তাদের আস্থা অর্জনে কতটা সফল হলো। আমাদের প্রত্যাশা-আত্মসমালোচনাবোধ জাগ্রত হোক প্রত্যেক দলের নেতাদের মধ্যে। আর এই শুভবোধের মধ্যদিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করুক সুস্থধারার গণতন্ত্র।
সানা/আপ্র/১১/২/২০২৬