ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি যে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে, তা স্বভাবতই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দুই দশক পর সরকার গঠনের সুযোগ পেলে তারা কী করতে চায়-সে বিষয়ে দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কণ্ঠে ঘোষিত এই ইশতেহারকে বিএনপি বলছে ‘নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি’। ‘মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়টি বিষয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ-বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়, আবার একেবারে গুরুত্বহীনও নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ইশতেহার বরাবরই উচ্চাকাক্সক্ষী ভাষায় ভরপুর। ভোটের আগে প্রতিটি দলই জনগণের সামনে উন্নয়ন, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রের স্বপ্ন তুলে ধরে। বাস্তবতা হলো, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতির বড় একটি অংশই কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। ফলে ইশতেহারের ভাষা যতই মানবিক বা অন্তর্ভুক্তিমূলক হোক না কেন, জনমনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকেই যায়-এসব প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য? এই জায়গায় বিএনপির ইশতেহার কিছুটা ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
‘প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতি’; ‘ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকার’- এ ধরনের বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিভাজন, দমন-পীড়ন ও আস্থার সংকটে থাকা রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইনের শাসন, ভোটের মর্যাদা ও জবাবদিহির কথা জোরালোভাবে উচ্চারিত হওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক। একই সঙ্গে সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্য দূর করার অঙ্গীকারও জনগণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন। তবে এখানেই আসে বাস্তবতার কঠিন প্রশ্ন। বিএনপি নিজেও অতীতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিল। তখন অনেক ক্ষেত্রেই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, দুর্নীতি দমন বা সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত সাফল্য দেখা যায়নি- এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ফলে আজ ‘আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না’ কিংবা ‘ভোটের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা’র প্রতিশ্রুতি দিতে হলে কেবল নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রূপরেখাও জনগণ প্রত্যাশা করে।
ইশতেহারে ৯টি অগ্রাধিকার নির্ধারণের বিষয়টি ভারসাম্যপূর্ণ বলেই মনে হয়। রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নগুলো একত্রে আনার চেষ্টা রয়েছে। কিন্তু কীভাবে এই অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবে রূপ পাবে, প্রশাসনিক সংস্কার কীভাবে হবে, রাজনৈতিক সহনশীলতা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে- এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় তত বাড়বে। সবশেষে বলতে হয়, ইশতেহার কোনো দলের সদিচ্ছার ঘোষণা মাত্র; সেটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই তার মূল্যায়ন হয়। বাংলাদেশের ভোটাররা এখন আর শুধু আশ্বাসে তুষ্ট নয়। তারা দেখতে চায়- ক্ষমতায় গেলে কে কীভাবে কথা রাখে। বিএনপির ঘোষিত এই ভারসাম্যপূর্ণ ইশতেহার যদি সত্যিই ‘নতুন রাষ্ট্রীয় চুক্তি’ হতে চায়, তবে সেটিকে প্রমাণ করতে হবে ক্ষমতার চর্চায়, কাগজের ভাষায় নয় কিংবা মুখের বুলিতে নয়। আমাদের প্রত্যাশা- দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় গেলে দলটি এবার অনেকটাই সংশোধিত হয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রবল প্রচেষ্টা করবে।
সানা/আপ্র/৭/২/২০২৬