বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, এবারের নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের নয়, দেশের পুনর্গঠনের নির্বাচন। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে ধর্ম, লিঙ্গ বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য থাকবে না। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান-সবার মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান সুযোগ থাকবে। খেটে খাওয়া মানুষ, ব্যবসায়ী ও নারীরা নিরাপদে চলাচল ও জীবনযাপন করতে পারবে।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় (বড় মাঠ) ও নীলফামারীর বড় মাঠে জেলা বিএনপির আয়োজনে নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। নীলফামারীর সমাবেশে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মীর সেলিম ফারুক সভাপতিত্ব করেন এবং জেলা সদস্য সচিব এসএম সাইফুল্লাহ রুবেল অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন।
তারেক রহমান বলেন, গত এক দশক ধরে দেশের মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। তারা কথা বলার স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। একইভাবে অর্থনৈতিক অধিকার থেকেও পিছিয়ে আছেন। যুবক-তরুণদের কর্মসংস্থান হয়নি, নারীদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি, কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়নি। মানুষের জীবন ও তাদের আত্মত্যাগকে কখনও বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ। জনগণের সমর্থন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই দেশের সমৃদ্ধি, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্যে বিএনপি কাজ করতে চায়।
উত্তরাঞ্চলকে কৃষিপ্রধান এলাকা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কৃষকদের ঋণের বোঝা লাঘবে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হবে। কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুরে প্রয়োজন অনুযায়ী হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) নির্মাণ করা হবে।’ চিনিকল, রেশম কারখানা ও চা শিল্প পুনরায় চালুর আশ্বাস দেন তিনি। ‘এসব শিল্প পুনরুজ্জীবিত হলে স্থানীয় অর্থনীতি সচল হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘যুবকদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে কারিগরি ও কৃষিভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মরত স্থানীয় তরুণদের জন্য ঠাকুরগাঁওয়ে আইটি পার্ক বা হাব স্থাপন করা হবে, যাতে তারা নিজ এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়।’
স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গ্রামে গ্রামে ‘হেলথকেয়ার কর্মী’ নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানান। এসব কর্মী মা ও শিশুদের ঘরে গিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেবেন। এছাড়া তিনি মেডিক্যাল কলেজ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যাডেট কলেজ স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা স্থানীয় বিমানবন্দর দ্রুত চালুর কথাও বলেন।
তারেক রহমান দেশের নারীদের ক্ষমতায়নের বিষয়ে বলেন, ‘নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। ঘরে ঘরে মা-বোনেরা এই কার্ডের মাধ্যমে স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার পরিচালনা করতে পারবে।’
কৃষকদের জন্য বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষক কার্ড দেওয়া হবে। ধানের শীষ বিজয়ী হলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হবে। এনজিও থেকে নেওয়া ক্ষুদ্রঋণও সরকারের পক্ষ থেকে পরিশোধ করা হবে। আমরা চাই এই এলাকায় কৃষিনির্ভর শিল্প বিকশিত হোক, যাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়।’
দেশের পুনর্গঠন পরিকল্পনায় তিনি বলেন, ‘মা-বোন ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে গ্রামে গ্রামে হেলথকেয়ার নিযুক্ত করা হবে। মেডিকেল কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। বন্ধ বিমানবন্দর চালু করা হবে।’
নির্বাচনী জনসভায় তিনি বলেন, ‘এই দেশ ২০ কোটি মানুষের। দেশের মানুষের সমর্থন ও ভালোবাসা নিয়ে বাংলাদেশকে পুনর্গঠন করতে চাই। খেটে খাওয়া মানুষ, ব্যবসায়ী ও মা-বোনেরা নিরাপদে চলাচল, কর্মসংস্থান ও চিকিৎসাসেবা পাবে।’
নীলফামারীর জনসভায় তারেক রহমান সতর্ক করেন, ‘সারাদেশে ধানের শীষের জোয়ার দেখে কিছু মহল নির্বাচনের বিরোধিতায় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তবে কেউ যদি নির্বাচন বন্ধের চেষ্টা করে, তার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, নির্বাচনে জয় লাভ করলে ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর ও পঞ্চগড়কে শিল্পে রূপান্তর করা হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সৈয়দপুর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তর, নারীদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আইটি হাব, হিমাগার ও শিল্প পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বক্তব্য শেষে তারেক রহমান ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুর-১ আসনের ধানের শীষ প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে ভোট প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, ‘আপনাদের কাজ হলো নির্বাচনের দিন পর্যন্ত প্রার্থীদের দেখাশোনা করা। জয়ী হলে তাঁদের দায়িত্ব হবে ২৪ ঘণ্টা জনগণের পাশে থাকা।’
সমাবেশে উপস্থিত বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে বাঁচাতে গোটা দেশ তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে। কঠিন সময়ে তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন; তাকে শতভাগ সমর্থন দিতে হবে।’
সানা/আপ্র/৭/২/২০২৬