গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মেনু

খালেদা জিয়াকে ভারতীয় সংসদের শ্রদ্ধা

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন বার্তা

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ২২:০৪ পিএম, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ২৩:৩৫ এএম ২০২৬
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন বার্তা
ছবি

খালেদা জিয়া

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ভারতের সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনেই বেগম জিয়ার স্মরণে শোক প্রস্তাব (অবিচুয়ারি রেফারেন্স) গ্রহণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হয়। গত বুধবার (২৮ জানুয়ারি) অধিবেশন শুরুর পর রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সি পি রাধাকৃষ্ণন শোক বার্তা পাঠ করেন। এরপর নীরবতা পালন করা হয়। শোক বার্তায় চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি গভীর দুঃখের সঙ্গে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের কথা স্মরণ করছি।’

ভারতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনের সূচনা হয় রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ভাষণের মধ্য দিয়ে। রাজ্যসভা ও লোকসভার যৌথ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর নিজ নিজ কক্ষের কার্যতালিকা অনুযায়ী, প্রয়াত ভারতীয় অন্য এমপিদের পাশাপাশি খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। এদিন ভারতের সাবেক এমপি এল গণেশন ও সুরেশ কলমাদিসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মরণেও শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

উল্লেখ্য, খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর গত ৩০ ডিসেম্বর মারা যান। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে তিনি তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি বিরোধী দলের নেত্রী ছিলেন।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী দেশের একজন সাবেক সরকারপ্রধানের স্মরণে ভারতের সংসদে এই শোক প্রস্তাব গ্রহণকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক শিষ্টাচার হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই শ্রদ্ধা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী ও ঐতিহাসিক ঘটনা। উপমহাদেশের রাজনীতিতে যেখানে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক প্রায়ই আবেগ, সন্দেহ ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশে আবদ্ধ থাকে, সেখানে একটি দেশের সংসদে অন্য দেশের একজন বিরোধী নেত্রীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার আবহে স্মরণ করা কেবল সৌজন্যমূলক আনুষ্ঠানিকতা কিংবা শিষ্টাচারই নয়; বরং একটি শক্ত রাজনৈতিক বার্তা। এই বার্তা শুধু বাংলাদেশ বা ভারত নয়, পুরো এশীয় ভূরাজনীতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।

বেগম জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্র। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শুধু একটি দলের নেতৃত্বই দেননি, বরং বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের উত্থান-পতনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিতর্কমুক্ত নয়; তবে বিতর্কই তাঁকে ইতিহাসের অংশ করে তুলেছে। ভারতের সংসদে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো মানে এই স্বীকৃতি দেওয়া যে, তিনি কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নেতা নন; বরং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ধারায় তাঁর একটি দৃশ্যমান প্রভাব রয়েছে।

এই শ্রদ্ধা নিবেদন এমন এক সময়ে, যখন ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সরকার পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক একটি স্পষ্ট অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সীমান্ত, বাণিজ্য, অভিবাসন ও কূটনৈতিক আস্থার জায়গায় যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা দুই দেশের জনগণের মধ্যেও অসন্তোষ-অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ঢাকায় এবং ঢাকার রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে দিল্লিতে যে সংশয় তৈরি হয়েছে, তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য সুখকর নয়।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের সংসদে খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানানোর ঘটনাটি একটি নরম কূটনৈতিক উদ্যোগ (ংড়ভঃ ফরঢ়ষড়সধপু) হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ভারত বাংলাদেশের বদলে যাওয়া রাজনীতিকে কেবল একটি দল বা একটি সরকারকেন্দ্রিক দৃষ্টিতে দেখছে না; বরং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ইতিহাস ও বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছে। এতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কাছেও একটি ইতিবাচক বার্তা যায় যে- ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে আগ্রহী।

এশিয়ার রাজনীতিতে এটি একটি নজিরও বটে। সাধারণত রাষ্ট্রীয় সংসদগুলোতে শ্রদ্ধা জানানো হয় নিজ দেশের নেতা বা খুব ঘনিষ্ঠ মিত্র রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানদের। সেখানে একজন প্রতিবেশী দেশের বিরোধী নেত্রীকে সম্মান জানানো মানে কূটনীতির প্রচলিত সীমারেখা কিছুটা অতিক্রম করা। এটি প্রমাণ করে যে, দক্ষিণ এশিয়ায় সম্পর্কের ভাষা বদলাচ্ছে। শুধু সরকার নয়, জনগণ ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের প্রতিও সম্মান প্রদর্শনের প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।

এই ঘটনাটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সাম্প্রতিক অবনতির কিছুটা হলেও উপশম ঘটাতে পারে। সম্পর্কের ক্ষত একদিনে সারে না; তবে প্রতীকী উদ্যোগ অনেক সময় বড় সংলাপের দরজা খুলে দেয়। খালেদা জিয়ার প্রতি এই শ্রদ্ধা বাংলাদেশের একটি বড় রাজনৈতিক ধারার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রতিফলন। এর ফলে ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় আস্থার সংকট কিছুটা কমতে পারে এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এটাও সত্য, একটি শ্রদ্ধা নিবেদনই সব সমস্যার সমাধান নয়। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে বাস্তব স্বার্থ, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর। সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো ইস্যুগুলোতে বাস্তব অগ্রগতি ছাড়া সম্পর্ক টেকসই হবে না। তবুও রাজনীতিতে প্রতীক ও বার্তার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

উপসংহারে বলা যায়, ভারতের সংসদে খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানানো একটি মুহূর্তের ঘটনা হলেও এর তাৎপর্য দীর্ঘমেয়াদি। এটি এশিয়ার রাজনীতিতে এমন পরিপক্বতার ইঙ্গিত দেয়- যেখানে মতভেদ সত্ত্বেও ইতিহাস ও অবদানকে সম্মান জানানো যায়। এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা শুধু ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আরো সহনশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলতে পারে।

সানা/আপ্র/৩০/০১/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

পবিত্র শবে বরাতে মানুষের মনে জেগে উঠুক শুভবোধ
০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

পবিত্র শবে বরাতে মানুষের মনে জেগে উঠুক শুভবোধ

মঙ্গলবার দিবাগত রাত পবিত্র শবে বরাত। মহিমান্বিত রাত হিসেবে প্রতি বছর হিজরি শাবান মাসের মাঝামাঝিতে মু...

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গুরুতর ত্রুটি
০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গুরুতর ত্রুটি

সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস

তরুণ রাজনীতির বড় পরীক্ষা
০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

তরুণ রাজনীতির বড় পরীক্ষা

প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মাঝখানে এনসিপি

সহিংসতামুক্ত নির্বাচন ও মানবাধিকার রক্ষাই হোক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অঙ্গীকার
৩১ জানুয়ারি ২০২৬

সহিংসতামুক্ত নির্বাচন ও মানবাধিকার রক্ষাই হোক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অঙ্গীকা...

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে জনমনে যেমন প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি উদ্বেগ ও শঙ্কাও। অতীত অভিজ্...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বাজারে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গ্যাস সংকটের সুযোগে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছে, এর মধ্যেই সরকার গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়েছে। এটা কতটা যুক্তিসঙ্গত মনে করেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে